|
প্রকল্পের নাম: রাজউক কাঁচা বাজার ঠিকানা: রোড-৪১৪, সেক্টর-০১ এবং রোড-৪০৭, সেক্টর-০৫, পূর্বাচল নিউ টাউন, ঢাকা। ক্লায়েন্ট: রাজউক মোট নির্মিত ক্ষেত্রফল: ৩৭৩৩.৩৮ বর্গমিটার। প্রকল্প সূচনা: ১০ অক্টোবর, ২০২৩। প্রকল্প সমাপ্তি: ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। স্থপতি/ ডিজাইন টিম: স্থপতি তারিক হাসান (প্রধান স্থপতি), স্থপতি মোহাম্মদ তৌহিদুর রহমান, স্থপতি নাবিল মেহেদী। স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার: ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ বুরহান উদ্দিন মোতায়েদ। ফটোগ্রাফার: মাড ক্যানভাস। |
|
পূর্বাচল নিউ টাউনের ১ ও ৫ নম্বর সেক্টরে নির্মিত রাজউক কাঁচা বাজার বাংলাদেশের প্রচলিত হাট-বাজারের সামাজিক ও স্থানীয় বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে শহরের পরিবেশে নতুনভাবে উপস্থাপনের একটি প্রচেষ্টা। ১.২৫ একর জমির ওপর নির্মিত দুইতলা এই বাজারটির নির্মাণকাজ ২০২৫ সালে শেষ হয়েছে। প্রকল্পটিকে কেবল বাণিজ্যিক স্থান হিসেবে নয়, বরং একটি সক্রিয় সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে ভাবা হয়েছে, যেখানে দৈনন্দিন কেনা-বেচা, পারস্পরিক ও সামাজিক যোগাযোগ একই পরিসরে সংগঠিত হয়। স্থপতির পরিকল্পনায় বাজারটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত জাঁকজমকপূর্ণ বা ব্যয়বহুল না করে সহজ, ব্যবহারিক এবং জনবান্ধব রাখা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে গ্রামীণ হাট-বাজারের স্বাভাবিকতা ও সামাজিক প্রাণশক্তিকে একটি নতুন নগর পরিবেশে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। |
|
প্রকল্পটির লোকেশন |
|
পরিকল্পিতভাবে জায়গার বিন্যাস ও সংযোগ বাজারটির নকশা ১০ ফুট × ১০ ফুট মড্যুলার গ্রিডের ভিত্তিতে তৈরি। এই বিন্যাসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মাপের দোকানঘরগুলোকে একটি পরিবর্তনযোগ্য কাঠামোর মধ্যে সাজানো হয়েছে। খোলা করিডোরের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দোকানঘরগুলো রয়েছে। ফলে বাজারের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা সহজে দেখা যায়। বাজারটির দৈনন্দিন কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খল করতে জনসাধারণের চলাচল এবং সার্ভিস এরিয়াগুলোকে পৃথক রাখা হয়েছে। উপরের তলায় সহজ ও সর্বজনীন যাতায়াত নিশ্চিত করতে ঢালু পথের (র্যাম্প) ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সার্ভিস এরিয়াগুলো পশ্চিম প্রান্তে রাখা হয়েছে, যা অতিরিক্ত তাপের প্রভাব কমাতে সহায়তা করে। |
|
করিডোরগুলো কেন্দ্রীয় উঠানের চারিপাশ ঘিরে রয়েছে, যা পুরো বাজারের সামাজিক যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এই কেন্দ্রীয় উঠান শুধু চলাচলের অংশ নয়; এটি ভবিষ্যতে অস্থায়ী বিক্রেতাদের জন্যও ব্যবহৃত হবে। হাটের মতোই এই পরিসরে মানুষ কেনাবেচা, অপেক্ষা, আলাপচারিতা ও দৈনন্দিন সামাজিক যোগাযোগে অংশ নিতে পারবে। কসাইখানাটি বাজারের পেছনের দিকে স্থাপন করা হয়েছে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তরল বর্জ্য নিষ্কাশন সরাসরি ভূগর্ভস্থ STP-এর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। |
|
১ |
২ |
|
ছবি ১: গ্রামীণ হাটের মতো বাজারটির কেন্দ্রীয় উঠানটি মানুষ কেনাবেচা এবং দৈনন্দিন সামাজিক যোগাযোগের পরিসর হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। ছবি ২: বাজারটির অভ্যন্তরীণ কেনাবেচার দৃশ্য। (ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে তৈরি করা হয়েছে) |
| কেন্দ্রীয় উঠানের চারিপাশ ঘিরে করিডোর |
|
প্রকল্পটির তিন দিকেই রাস্তা থাকায় এবং পার্শ্ববর্তী আবাসিক এলাকার বিষয়টি বিবেচনা করে মূল রাস্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে সেকেন্ডারি রাস্তা থেকে বাজারে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে লোডিং-আনলোডিং ও অন্যান্য সার্ভিস প্রবেশের জন্য পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে সাধারণ ক্রেতাদের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে। |
| সেকেন্ডারি রাস্তা থেকে বাজারে মানুষ এবং সার্ভিস সমূহের পৃথকভাবে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে |
|
| উক্ত সেকশনে বাজারের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক বাতাস চলাচলের পদ্ধতি দেখানো হয়েছে |
| বাজারের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো বাতাস প্রবেশের ব্যাবস্থা করা হয়েছে |
|
ছাদের বিস্তৃত কার্নিশ ও ওভারহ্যাং বাজারের অভ্যন্তরকে তীব্র রোদ ও বর্ষাকালের ভারী বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি ছাদ, গাটার ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার সমন্বয়ে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সংগৃহীত পানি বাগানসহ অন্যান্য কাজে পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বন্যার সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় ভবনটি উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের চারপাশে পৃথক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক রাখা হয়েছে, যাতে বৃষ্টির পানি চলাচলের পথে জমে না থাকে। মাটির নিচে STP এবং ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল সংযোজন প্রকল্পটির পরিবেশগত কর্মদক্ষতাকে আরও জোরদার করেছে।
|
মেঝের পানি নিষ্কাশনের জন্য ঢাকনাযুক্ত ড্রেন এবং ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য গাটারের ডিটেইল ড্রয়িং |
| উক্ত সেকশনে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জন্য নির্মিত ছাদের গাটার এবং মেঝের ঢাকনাযুক্ত ড্রেনগুলোর অবস্থান দেখানো হয়েছে |
|
| প্রিফেব্রিকেটেড স্টিলের কাঠামো এবং সেমি-ড্রেসড সিমেন্ট কংক্রিটের মেঝে |
| বৈদ্যুতিক তার, কেবল ট্রে, অগ্নিনিরাপত্তা পাইপ, ফায়ার হাইড্র্যান্ট গুলোকে দৃশ্যমান রাখা হয়েছে |
|
রাজউক কাঁচা বাজারের পরিকল্পনার মূল ধারণার সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রামীণ হাট-বাজার সংস্কৃতি গভীরভাবে যুক্ত। শহুরে পরিবেশের প্রচলিত বাজারের মতো এখানে কেনাবেচা ও সামাজিক জীবনকে আলাদা করে দেখা হয়নি; বরং একই কাঠামোর মধ্যে তাদের সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় উঠানকে অস্থায়ী বিক্রেতা, ক্রেতা এবং স্থানীয় মানুষের মিলনকেন্দ্র হিসেবে ভাবা হয়েছে। মুদি দোকানের পাশাপাশি চায়ের দোকান, ছোট খাবারের দোকান এবং বসার জায়গার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। |
|
স্থপতির বক্তব্যে স্পষ্ট যে, প্রকল্পটিকে একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল বা দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে একটি এলাকার মিলনকেন্দ্র হিসেবে চিন্তা করা হয়েছে। জলবায়ু উপযোগী নকশা, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, সহজলভ্য সাশ্রয়ী ম্যাটেরিয়াল এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে বাজারটি দৈনন্দিন নগরজীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি সক্রিয় সামাজিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করে। পরিশেষে বলা যায়, রাজউক কাঁচা বাজারের নকশা তাই কেবল একটি বাজার ভবনের নির্মাণ নয়; বরং গ্রামীণ হাটের চিরাচরিত সামাজিক পরিবেশকে সমকালীন নগর অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্রয়াস। |
| প্রতিবেদকঃ মুনিয়া আহমেদ মিম। |