ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: স্থান ও পথের এক সংলাপ

স্থাপত্য ও নির্মাণ
শিক্ষার্থীদের প্রকল্প
১ জানুয়ারী, ২০২৬
২৪
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: স্থান ও পথের এক সংলাপ

প্রকল্পের শিরোনাম: ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: স্থান ও পথের এক সংলাপ

প্রকল্পের স্থান: সিলেট, বাংলাদেশ

শিক্ষার্থীর নাম: মুহাইমিন ইসলাম

বছর: ২০২৫

প্রকল্প তত্ত্বাবধায়কদের নাম: স্থপতি ড. ইফতেখার আহমেদ, স্থপতি ড. মোহাম্মদ ফারুক, স্থপতি জিল্লুর রহমান এবং স্থপতি বায়েজিদ এম. খন্দোকার

বিশ্ববিদ্যালয়: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

Muhaimin Islamমুহাইমিন ইসলাম

Study

বিমানবন্দরকে সাধারণত একটি শহরের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেউ কোনো শহরে প্রবেশ বা প্রস্থান করার সময় এটি-ই হয় তার দেখা প্রথম ও শেষ স্থান। ফলে, একটি বিমানবন্দর পর্যটকদের কাছে সে শহর সম্পর্কে প্রথম ধারণা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অথচ বাংলাদেশে অধিকাংশ বিমানবন্দর টার্মিনাল স্থানীয় প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্নরূপে অবস্থিত। সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বর্তমান আন্তর্জাতিক টার্মিনালও এর ব্যতিক্রম নয়।

 

সিলেট শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত বিমানবন্দরটি চারদিকে সবুজ মাঠ ও টিলাময় ভূপ্রকৃতিতে ঘেরা। বিমানবন্দর নির্মাণের পর এর আশপাশ ধীরে ধীরে শহরের প্রান্তে একটি নতুন বাণিজ্যিক অঞ্চলে রূপ নিয়েছে। এখানে গড়ে উঠেছে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও পার্ক, যা স্থানীয়দের জন্য এলাকাটিকে একটি গণ-গন্তব্যে পরিণত করেছে।

“আমরা সাধারণত বিমানবন্দর বলতে কী বুঝি? এটি কি শুধু পরিবর্তনের স্থান, নাকি জনসাধারণের যোগাযোগের স্থান? তবে কেন দুটোই নয়?”

এ প্রশ্নগুলো থেকেই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য নির্ধারিত হয় - বিমানবন্দরের ভেতর জনসাধারণের প্রবেশাধিকারের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি টার্মিনাল নকশা করা যা সাধারণ দর্শনার্থীদেরও নিয়ন্ত্রিতভাবে এই পরিসর উপভোগ করতে দেয়। ধারণাটি হলো বিমানবন্দরকে ভাবা - একইসঙ্গে একটি টার্মিনাল এবং একটি পার্ক হিসেবে।

 

এই ধারণাটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে অস্মোসিস দর্শনের মাধ্যমে, যা স্থাপত্যে এমন এক নির্মিত পরিসরকে বোঝায় যেখানে নিয়ন্ত্রিত চলাচল ঘটে। পাশাপাশি, প্রকল্পটি সাইটের হারিয়ে যাওয়া টিলা পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে কৃত্রিম ভূমিভাগে চা-বাগান সংযোজন করেছে। সিলেটের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এই চা-বাগানগুলো দুটি উদ্দেশ্য পূরণ করে - সুন্দর গণ-পরিসর সৃষ্টি করা এবং বিমানবন্দরের অতিরিক্ত অর্থনৈতিক আয় নিশ্চিত করা। যেহেতু চা-বাগান সিলেটের প্রধান আকর্ষণ, বিমানবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই চা-বাগান ভবনটিকে পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য নতুন আকর্ষণে পরিণত করবে।

Design Decisions
 

রূপ ও কাঠামো

টার্মিনালের স্থাপত্যরূপ সরাসরি আশেপাশের টিলাময় ভূখণ্ড থেকে অনুপ্রাণিত। স্ট্যান্ডিং সিম মেটাল ক্ল্যাডিং ও স্টিল ট্রাসে নির্মিত সুপার-রুফটি ভূমির ঢেউখেলানো উচ্চতা-নিম্নতার প্রতিফলন। গাছ-সদৃশ কাঠামোগত কলাম - সিলেটের চা চাষের ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত -একইসঙ্গে প্রতীকী এবং কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

Form Generation

 
 Flow DiagramZoning Diagram 
00 Master Plan

পরিকল্পনা

গ্রাউন্ড লেভেল (০’)

এ তলায় রয়েছে প্রধানত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত খুচরা বাণিজ্যিক এলাকা, ভিআইপি জোন, ব্যাগেজ ক্যারোসেল ও স্টোরেজ, রিমোট ড্রপ-অফ ও বোর্ডিং হল এবং এয়ারসাইডের রক্ষণাবেক্ষণ এলাকা। এই স্তরে সাধারণ মানুষের চলাচল এবং সাইটের প্রবেশ নোডের প্রেক্ষাপটে সংযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পথচারী গতি ও হাঁটাচলার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে টার্মিনালসহ উন্মুক্ত এলাকাগুলোতে সহজ প্রবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।

বেজমেন্ট লেভেল (-২০’)

কৃত্রিম টিলার নিচে কেটে তৈরি এই স্তরে রয়েছে ইমিগ্রেশন হল, আগমনী হল থেকে সংযোগ, ব্যাগেজ ক্লেইম, কাস্টমস এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা। এ স্তর থেকে বের হয়েই যাত্রীরা একটি বৃহৎ সানকেন কোর্টইয়ার্ডে পৌঁছানযা অফিসিয়াল মিট-অ্যান্ড-গ্রিট এলাকা। এখানে রয়েছে একাধিক খুচরা দোকান ও সুবিধা, যা জনসম্পৃক্ততা ও বিনোদনকে সমর্থন করে।

প্রথম তলা (১৫’)

এখানে অবস্থিত প্রধান আগমনী হল। বহুস্তরবিশিষ্ট লবি চা-বাগানের দিকে খোলা, যেখানে বিশ্রাম অঞ্চল ও ইনডোর জেন বাগান রয়েছে।

দ্বিতীয় তলা (+৩০’)

এ তলা থেকেই যাত্রীরা তাদের যাত্রা শুরু করেন। ল্যান্ডসাইডে রয়েছে চেক-ইন কাউন্টার, লাউঞ্জ এবং বিভিন্ন সুবিধা। এয়ারসাইডে রয়েছে প্রধান ডিপার্চার হল। এ তলাটি একটি পাদচারণা স্কাইওয়ের মাধ্যমে সাইটের প্রধান প্রবেশ নোডের সঙ্গে সরাসরি যুক্তযা জনসাধারণের চলাচলকে আরও সহজ করেছে

তৃতীয় তলা (+৪৫’)

ইমিগ্রেশন বুথগুলো সরাসরি দ্বিতীয় তলা থেকে প্রবেশযোগ্য। এই তলায় দুটি সেতু রয়েছে যা কেন্দ্রীয় চা-বাগান স্পাইনের উপর দিয়ে ল্যান্ডসাইডকে এয়ারসাইডের সঙ্গে যুক্ত করে।

01 Ground Floor Plan
02 Basement Floor Plan03 First Floor Plan04 Second Floor Plan05 Third Floor Plan
Sections

এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো বিমানবন্দরকে নতুনভাবে ভাবাযেখানে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যায়। নকশায় স্থানিক প্রেক্ষাপটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যাতে বিশাল কাঠামো হয়েও ভবনটি আশেপাশের পরিবেশের সঙ্গে সুরেলা সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। পরিকল্পনা ও জোনিং এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও জন-অংশগ্রহণ বজায় রেখে ভবনের ভেতরে মসৃণ চলাচল নিশ্চিত হয়।

বিমানবন্দর কেবল নিয়মবদ্ধ পরিসর হওয়া উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত এমন এক স্থান যা শহরের সঙ্গে মিশে যায়, তার পরিচয় ধারণ করে এবং যার প্রকৃত উদ্দেশ্য; মানুষ, তাদেরই সেবা করে।

জুরি মন্তব্য

ড. মোহাম্মদ হাবিব রেজা

সহযোগী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

“এটি এমন একটি বিমানবন্দর, যা আমি সিলেটে বাস্তবায়িত হতে দেখতে পারি। এবং এটি এমন কিছু, যা সিলেটের প্রাপ্য।”

ড. সাইমুম কবীর সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

“এই প্রকল্পে সার্কুলেশন এবং প্রোগ্রামের প্রবাহ যেভাবে সাজানো হয়েছে, তা আমাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে বিমানবন্দরের সম্ভাবনার এক শক্তিশালী প্রমাণ। এবং এই নকশার কিছু বিবেচনা আমাদের দেশে এত বড় ও বিশাল ভবন নকশার সময় খুব কমই গুরুত্ব পায়।”

Main Model
Aerial ShotBaggage Claim.pngHero ShotMeet and Greet

প্রতিবেদক: স্থপতি ফাইজা ফাইরুজ

আপনার মতামত দিন

কমেন্ট

Logo
Logo
© 2026 Copyrights by Sthapattya o Nirman. All Rights Reserved. Developed by Deshi Inc.