|
প্রকল্পের শিরোনাম: পাটতরি সাইটের অবস্থান: কেওরিয়াপাড়া, নরসিংদী, বাংলাদেশ শিক্ষার্থীর নাম: ফাতিহা তানজীম অনি শিক্ষাবর্ষ: ২০২৫ প্রকল্পের শিক্ষকবৃন্দ: ড. মোহাম্মদ ফারুক, ড. ইফতেখার আহমেদ, মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, বায়েজিদ এম. খন্দকার বিভাগীয় প্রধানের নাম: ড. ফুয়াদ এইচ. মালিক বিশ্ববিদ্যালয়: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় |
|
|
প্রকল্পের প্রেক্ষাপট আলিজান জুট মিলের পুনরুজ্জীবন প্রকল্পটি নরসিংদীর মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক যুগের অন্যতম শিল্প-স্থাপত্য নিদর্শনের অভিযোজনমূলক পুনর্ব্যবহারের সম্ভাবনা অন্বেষণ করে। একসময়ের পাট বা সোনালী আশ সম্পর্কিত অর্থনীতির কেন্দ্র ছিল এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি, যা সমৃদ্ধি ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু পাটশিল্পের পতনের সাথে অবহেলা, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবে একটি পরিত্যক্ত ভবনের কম্পলেক্সে পরিনত হয়েছে। যা নরসিংদীবাসীর কাছে সেই সোনালী কালের নীরব সাক্ষী। এই প্রস্তাবিত প্রকল্পের লক্ষ্য হলো এলাকাটিকে একটি প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, যেখানে স্মৃতি, ঐতিহ্য ও নতুন সম্ভাবনা একত্রিত হয়ে ভবিষ্যৎ রচনা করবে। |
|
সাইটটির পরিমাণ ৪১ একর, যার মধ্যে মূল মিল ভবনটি ৪.৫৩ একরজুড়ে অবস্থিত। পরিবেশগত বিধিনিষেধ অনুসারে নদী-তীর থেকে ১৫০ ফুটের মধ্যে কোনো নতুন ইমারত নির্মাণ করা হয়নি, যা মেঘনার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং এর সাংস্কৃতিক গুরুত্বকেও সম্মান করবে। পুরনো কারখানা ভবনের ভেতরে একটি আধুনিক বাজার প্রস্তাব করা হয়েছে - এটি এমন এক অভিযোজনমূলক পুনর্ব্যবহারের মডেল যা শিল্প ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে পুনরুজ্জীবিত করবে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ নতুন পাট উৎপাদন সুবিধা প্রতিষ্ঠা করা হবে, যাতে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পাটের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। প্রায় ২০০ জন কর্মীর জন্য প্রস্তাবিত আবাসন ব্যবস্থা সাইটটিকে শ্রমজীবী মানুষের জীবনের মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। |
|
জোনিংয়ের মাধ্যমে সাইটে স্পষ্ট কিন্তু আন্তঃসংযুক্ত তিনটি পরিসর তৈরি করা হয়েছে: বাম পাশে জাদুঘর, ডান পাশে লিনিয়ার মার্কেট এবং মাঝখানে জনসাধারণের সবুজ খোলা স্থান। এগুলো কেবল কার্যকরী ভূমিকা নয়, প্রতীকী অর্থও বহন করে- জাদুঘর স্মৃতি সংরক্ষণ করে, বাজার জীবিকার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে, আর সবুজ স্থানগুলো সামষ্টিক শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। মূল ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের ধরন থেকে উদ্ভূত প্রস্তাবিত ছাদের মডিউল অতীত ও বর্তমানকে সংযুক্ত করে এবং শিল্প-ঐতিহ্যকে স্থাপত্যিক রূপে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। সাংস্কৃতিকভাবে, এই প্রকল্প নরসিংদীর শিল্প ঐতিহ্য- যা একসময় পাট চাষ ও বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত টেক্সটাইল কেন্দ্র ছিল- পুনরুদ্ধার করে এবং এটিকে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে পুনর্বিন্যস্ত করে। একই সঙ্গে এটি বিশ্বজুড়ে দেখা যাওয়া পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল পতনের মোকাবিলায় নতুন প্রস্তাবনা দেয়। যার মাধ্যমে পরিত্যক্ত এক শিল্প স্থাপনা থেকে মিলটি পরিণত হয় সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের প্রতীকে- যা দেখায় পরিত্যক্ত কারখানাগুলো কীভাবে নতুন সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পুনর্কল্পিত হতে পারে। |
|
কনসেপ্ট ধারণাগতভাবে, প্রকল্পটি নব প্রাসঙ্গিকতাবাদ (New Contextualism)-এর আদর্শে নির্মিত। প্রচলিত কনটেক্সচুয়ালিজম যেখানে প্রায়শই বাহ্যিক সামঞ্জস্যের ওপর গুরুত্ব দেয়, সেখানে নব প্রাসঙ্গিকতাবাদ সাইটের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, পরিবেশগত, সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক, ভৌগোলিক, স্থাপত্যিক ও নগর বাস্তবতার বহুস্তরকে একত্রে বিবেচনা করে। আলিজান জুট মিলের ক্ষেত্রে এটি অর্থনৈতিক পতনের ফলে সৃষ্ট সামাজিক বিচ্যুতি, নদী-তীরবর্তী উন্নয়নের পরিবেশগত সংবেদনশীলতা, এবং জুটের সাংস্কৃতিক প্রতীকবোধ - এসবের সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রস্তাব করে। প্রকল্পটি আসলে একটি প্রাসঙ্গিক সংলাপ- যেখানে ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং অভিযোজনমূলক বাণিজ্যিক কৌশল সমান্তরালে কাজ করে। |
|
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মিলটি আর বিচ্ছিন্ন ধ্বংসাবশেষ নয়; বরং এটি কমিউনিটি, অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থার একটি নোড। কারুশিল্প, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং সাংস্কৃতিক স্থান অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবন আর কেবল স্মৃতিনির্ভর নয়, ভবিষ্যতমুখী। ঔপনিবেশিক যুগের শিল্প স্মৃতিকে সমসাময়িক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বুনে প্রকল্পটি দেখায় কীভাবে স্থাপত্য ইতিহাস ও অগ্রগতি, পরিবেশ ও শিল্প, স্থানীয় পরিচয় ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।
অবশেষে, আলিজান জুট মিল পুনর্জাগরণ প্রকল্পটি ধারাবাহিকতার এক মেনিফেস্টো। এটি এমন এক ভবিষ্যৎ প্রস্তাব করে যেখানে শিল্প ঐতিহ্য পুনরাবিষ্কৃত হয়, পরিচয় বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতা পায়, এবং স্থাপত্য অর্থনৈতিক পুনরুত্থান ও সাংস্কৃতিক স্থিতিস্থাপকতার চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে- নব প্রাসঙ্গিকতাবাদের নীতিমালা দ্বারা পরিচালিত। ডিজাইনের বাইরে, এটি এক বার্তা- কীভাবে পরিত্যক্ত মিলগুলোকে জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে পুনরুদ্ধার করা যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। |
|
পুনর্জাগরণের প্রতিবন্ধকতা |
|
|
বৃহত্তর ভিশন সামাজিক: কারুশিল্পীদের ক্ষমতায়ন + শ্রমিক আবাসন। |
|
ড. মোহাম্মদ ফারুক এই প্রকল্পের শক্তি নিহিত আছে ঐতিহ্য, কমিউনিটি, অর্থনীতি এবং পরিবেশ- এই চারটি মাত্রাকে একীভূত স্থাপত্যিক ভাষায় দক্ষতার সাথে বুনে ফেলার ক্ষমতায়। যেখানে অনেক উপযোগী-পুনঃব্যবহার প্রচেষ্টা কেবলমাত্র ভৌত সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে এই কাজটি আরও অগ্রগামী - শিল্পাঞ্চলটিকে পুনরায় কল্পনা করেছে একটি সামাজিকভাবে প্রাণবন্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল কেন্দ্রে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রকল্পটি দেখিয়েছে যে পরিত্যক্ত শিল্প-অবকাঠামো কীভাবে সংবেদনশীলতা ও দূরদর্শিতার সাথে রূপান্তর করলে সক্রিয় জনসম্পদে পরিণত হতে পারে। এই থিসিসটি প্রাসঙ্গিক চিন্তার একটি অনন্য উদাহরণ এবং স্টুডিওর সবচেয়ে সংহত ও সুপ্রতিষ্ঠিত প্রকল্পগুলোর অন্যতম হিসেবে বিশেষভাবে উজ্জ্বল। |
| প্রতিবেদক: স্থপতি ফাইজা ফাইরুজ |