|
স্থপতি সামান্থা লামিসা
ভেনিসে অনুষ্ঠিত স্থাপত্য বিষয়ক দ্বিবার্ষিক সম্মেলনটি ভেনিস আর্কিটেকচার বিয়েনালে নামে পরিচিত, যেখানে স্থাপত্যকে বড় পরিসরে প্রকাশ করা এবং বোঝার আয়োজন করা হয়। ইতালিয়ান শিক্ষাবিদ ও স্থপতি কার্লো রাত্তির তত্ত্বাবধানে ২০২৫ সালের ১৯তম ভেনিস আর্কিটেকচার বিয়েনালের মূল বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে - “Intelligens: Natural. Artificial. Collective.”। এই আসরের উদ্দেশ্য হলো বর্তমান বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে স্থাপত্যের ভবিষ্যৎ নতুনভাবে ভাবা, বিশেষ করে সাস্টেইনেবিলিটি বা টেকসই স্থাপত্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থাপত্যের ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া। “Intelligens: Natural. Artificial. Collective.” থিমের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ভেনিস আর্কিটেকচার বিয়েনালের স্প্যানিশ প্যাভিলিয়নের বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে “Internalities” বা অভ্যন্তরীণতা। |
|
এই প্রদর্শনীর কিউরেটর হিসেবে কাজ করছেন স্পেনের দুইজন স্থপতি ও শিক্ষাবিদ - রোই সালগুইরো এবং ম্যানুয়েল বুজাস। রোই সালগুইরো বোস্টনের একজন স্প্যানিশ স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ। তিনি এমআইটি’র স্থাপত্য বিভাগে শিক্ষকতা করেন এবং মর্নিংসাইড একাডেমি ফর ডিজাইনের কিউরেটোরিয়াল ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ম্যানুয়েল বোজাস গ্যালিসিয়া ও নিউইয়র্কের একজন স্প্যানিশ স্থপতি। তাঁর কাজের ক্ষেত্র বিস্তৃত - স্থাপত্য চর্চা, শিক্ষা, কিউরেটিং, গবেষণা এবং প্রকাশনা। তিনি কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচার, আর্ট অ্যান্ড প্ল্যানিং (AAP) বিভাগের একজন শিক্ষক এবং ‘ইন্টার্নালিটি’ প্রদর্শনীর কিউরেটর। ২০২৫ সালে স্প্যানিশ রাজপরিবারের প্রদত্ত ‘প্রিন্সেস অফ জিরোনা আর্টস অ্যাওয়ার্ড’ পেয়ে তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি অর্জন করেন। |
স্থপতি রোই সালগুইরো এবং ম্যানুয়েল বুজাস গ্যালিসিয়ার অফিসিয়াল কলেজ অফ আর্কিটেক্টসের জার্নাল ‘ওব্রাডোইরো’-এর সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। |
|
প্রকৃতি কোনো বর্জ্য তৈরি করে না, কিংবা বাহ্যিক কিছু উৎপন্ন করে না। তাহলে যদি স্থাপত্য চর্চায়ও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়, কী ঘটবে? |
|
|
২০২৫ সালের ১৯তম ভেনিস আর্কিটেকচার বিয়েনালের স্প্যানিশ প্যাভিলিয়ন গড়ে উঠেছে এমন এক ধারণাকে কেন্দ্র করে, যার বাস্তবে কোনো নির্দিষ্ট রূপ নেই - “Internalities” বা “অভ্যন্তরীণতা”। এখানে মূল ভাবনা হলো, স্থাপত্যে নির্মাণ প্রক্রিয়ায় যে কাঠামোগত ও পরিবেশগত প্রভাব সৃষ্টি হয়, সেগুলোতে কীভাবে কার্বনের পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়। “অভ্যন্তরীণতা” ধারণাটি আধুনিক স্প্যানিশ স্থাপত্যচর্চার দিকগুলোকে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের স্থপতিদের কাজ ও ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসে। একইসঙ্গে, এই প্রদর্শনীটির মূল লক্ষ্য হলো - কীভাবে পরিবেশ ও অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়। তাদের কাজের মূল বৈশিষ্ট্য হলো - স্থানীয়, নবায়নযোগ্য এবং অত্যন্ত কম কার্বন নির্গমনকারী নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার। কাঠ, পাথর ও মাটির মতো উপকরণ এবং যেসব প্রাকৃতিক উৎস থেকে এগুলো আসে - যেমন বন, খনিজ ও মাটি - এসবের সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক স্থাপত্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। |
|
|
|
|
|
বাহ্যিকতা থেকে অভ্যন্তরীণতা অভ্যন্তরীণতা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো এটিকে বাহ্যিকতার বিপরীত হিসেবে কল্পনা করা। ‘বাহ্যিকতা’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ আর্থার পিগো, ১৯২০ সালে। তিনি এটি ব্যবহার করেছিলেন এমন সব পরোক্ষ খরচ বোঝাতে, যা কোনো পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকেও মানুষ ও পরিবেশকে প্রভাবিত করে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, উপ-পণ্য, বর্জ্য ও নির্গমন - সবই বাহ্যিকতার অংশ, যা সাধারণ উৎপাদন প্রক্রিয়ার ফলাফল। নির্মাণ কাজ বাহ্যিকতার একটি বড় উদাহরণ। এর প্রভাব এত ব্যাপক যে, বিশ্বব্যাপী মোট CO₂ নির্গমনের প্রায় ৩৭% আসে নির্মাণ খাত থেকে। |
|
স্থাপত্যে বাহ্যিকতা শুরু হয় বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় - কাঁচামাল সংগ্রহ করার সময়, শক্তি ব্যবহারের সময়, বর্জ্য তৈরি হওয়ার সময়। এইসব প্রক্রিয়ার ফলে আমরা যে ভবন তৈরি করি ও পরিবেশের ওপর যতটা প্রভাব ফেলি, তার মধ্যে একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। আর এই ভারসাম্যহীনতাই বর্তমান পরিবেশগত সংকটের অন্যতম বড় কারণ। স্থপতি ও শিক্ষাবিদ রোই সালগুইরো জানান, স্থপতি কার্লো রাত্তি এই বিয়েনালের জন্য প্রতিটি জাতীয় প্যাভিলিয়নকে একটি জায়গা এবং একটি সমাধান উপস্থাপন করতে বলেছেন। এই ধারায় আমরা উপস্থাপন করছি আমাদের জায়গা - স্পেন, এবং আমাদের সমাধান -“অভ্যন্তরীণতা” (Internalities)। এটি কোনো ব্যক্তিনির্ভর সমাধান নয়; বরং একটি ধারণা, যা দেখায় নতুন প্রজন্মের স্প্যানিশ স্থপতিরা কীভাবে ভিন্নভাবে কাজ করছে। “অভ্যন্তরীণতা” এমন একটি ধারণা, যা সাস্টেইনেবিলিটি বা টেকসই স্থাপত্যের চেয়েও আরও স্পষ্ট ও গভীরভাবে স্থাপত্যের ভাবনাকে প্রকাশ করে। প্রদর্শনীটি একটি কেন্দ্রীয় স্থানকে ঘিরে সাজানো হয়েছে, যা পুরো প্রদর্শনীর ভূমিকা অংশ হিসেবে কাজ করে। এই কেন্দ্রের চারপাশে রয়েছে পাঁচটি কক্ষ, প্রতিটি নির্দিষ্ট একটি গবেষণার ধারণাকে অনুসন্ধানের জন্য তৈরি। কেন্দ্রীয় কক্ষটির নাম “Balance” বা “ভারসাম্য”। এখানে আইবেরিয়ান উপদ্বীপজুড়ে বিভিন্ন স্টুডিওর তৈরি ১৬টি সাম্প্রতিক স্থাপত্য ও ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্প প্রদর্শিত হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো নির্মাণ খাতকে ডিকার্বনাইজেশন প্রক্রিয়ার দিকে নিয়ে যাওয়া এবং অঞ্চলভিত্তিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ধারণা প্রকাশ করে। প্রদর্শনীটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, প্রতিটি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়েছে কাঠের তৈরি দাড়িপাল্লা আকৃতির কাঠামোয়। এই দাড়িপাল্লার মতো নকশা প্রতীকীভাবে দেখায় - কীভাবে একটি প্রকল্প পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। |
“Internalities” প্রদর্শনী |
|
|
প্রতিটি দল দুটি মডেল প্রদর্শন করে। একটির কাজ হলো স্থানীয় দিক দেখানো, যেখানে প্রকল্পের নির্মাণ সাইটগুলো দেখানো হয়। অন্যটি একটি বিশদ মডেল, যা মূলত নির্মাণ ব্যবস্থার ওপর ফোকাস করে। উভয় মডেলকে একটি বড় ভারসাম্য স্কেলের বিপরীত দিকে স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি, দাড়িপাল্লার কাঠামোও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত। |
|
| সর্বোপরি, “ব্যালেন্স রুম” দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করে - কীভাবে অভ্যন্তরীণতার ধারণার মধ্যে পরিবেশগত এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের চ্যালেঞ্জগুলো প্রকাশ পায়। এটি দর্শকদের ভাবায় - স্থাপত্য চর্চার মূল উদ্দেশ্য কী এবং কীভাবে আমরা পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হতে পারি। |
|
|
রোই সালগুইরো এবং ম্যানুয়েল বুজাস বলেন, “যখনই আমরা একটি জায়গা তৈরি করি, তার বিপরীতে কিছু না কিছু ধ্বংস করি।” প্রতিটি ভবন এবং তার চারপাশের এলাকা একে অপরের সঙ্গে একটি বিশেষ বস্তুগত সম্পর্কের মাধ্যমে জড়িত থাকে। এই সম্পর্কটি যেন ইতিবাচক হয়, তা নিশ্চিত করা স্থপতিদের কাজ। প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় অংশ মূলত এই ভাবনাটিকে সামনে নিয়ে আসে। প্যাভিলিয়নে প্রদর্শিত প্রকল্প, গবেষণা এবং ফটোগ্রাফি দেখায় কীভাবে স্থানীয়, পুনরায় ব্যবহারযোগ্য এবং কম কার্বন নির্গমনকারী সম্পদ ব্যবহার করা যায়। একইসাথে, এগুলো আমাদের ভাবায় -আমাদের নির্মিত স্থাপত্যের উপকরণ সংগ্রহ, উৎপাদন, বিতরণ, ইনস্টলেশন এবং পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়ায় নির্গমন কমানোর উপায় কী হতে পারে। |
|
প্রদর্শনীটি কাঠ, পাথর ও মাটির মতো সম্পদ এবং এগুলো যে পরিবেশ থেকে আসে - বন, খনি, মাটি - এর স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রকেও তুলে ধরে। কেন্দ্রীয় কক্ষের পাশাপাশি প্রদর্শনীটি স্প্যানিশ স্থাপত্যে ডিকার্বনাইজেশনকে কেন্দ্র করে গঠিত পাঁচটি মূল ধারণার ওপর সাজানো হয়েছে: উপকরণ (Materials), শক্তি (Energy), শ্রম (Labour), বর্জ্য (Residues),নির্গমন (Emissions)।
এ ধারণাগুলো স্থানীয় স্থপতি ও ফটোগ্রাফারদের একটি দল দ্বারা উপস্থাপিত হয়েছে, যারা স্পেনের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভূগোল এবং সেই অঞ্চলের সম্পদ নিয়ে কাজ করেছেন। এই অঞ্চলগুলো হলো: ক্যান্টাব্রিয়ান উপকূল, কেন্দ্রীয় মহানগর এলাকা, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ এবং আটলান্টিক উপকূল। প্রতিটি অঞ্চলে পাঁচটি দলের সদস্যরা -স্থপতি, গবেষক এবং ফটোগ্রাফার - মিলে কাজ করেছেন। তাদের কাজ দেখায়, প্রতিটি আঞ্চলিক পরিবেশের সাথে স্থাপত্য কীভাবে খাপ খায় এবং কীভাবে ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর ও অনুকরণযোগ্য সমাধান তৈরি করা যায়। |
|
|
|
|
প্রদর্শনীর আরেকটি দিক হলো, প্রতিটি ছবি বা নকশা দেয়ালে সরাসরি কাগজের কার্ডবোর্ডে সাজানো হয়েছে, কোনো সাধারণ ফ্রেম ব্যবহার করা হয়নি। কিউরেটর রোই সালগুইরো- এর কাছে যখন এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তিনি বলেন: “ধন্যবাদ, এটি লক্ষ্য করার জন্য। এই প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে আমরা শুধুমাত্র গাছ থেকে তৈরি ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করেছি। আমরা বিশেষভাবে গালিশিয়ান পাইন গাছ বেছে নিয়েছি, কারণ এটি স্পেনের গ্যালিসিয়ার সেই অঞ্চলের বন থেকে আসে, যেখানে বনায়নের একটি বিশেষ ধরন রয়েছে। আমরা গাছগুলোকে তাদের কাঠের ধরন অনুযায়ী বাছাই করেছি এবং সেই কাঠ থেকে তৈরি হয়েছে কার্ডবোর্ড।আসলে, প্রদর্শনীর সব উপকরণই জৈব, এবং আমরা প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে অন্যান্য উপকরণ যেমন অ্যালুমিনিয়াম বা প্লাস্টিক ব্যবহার করতে চাইনি।” |
|
|
স্থপতি ও শিক্ষাবিদ ম্যানুয়েল বুজাস বাংলাদেশি তরুণ স্থপতিদের জন্য বলেন, একজন স্থপতি হিসেবে অনেক কিছু করার সুযোগ থাকে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যদি নির্মাণ কৌশল নিয়ে সচেতন হতে চান তবে আপনাকে প্রশ্ন করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী নিজের কাজ পরিবর্তন করতে হবে। আপনার কাজের অবশ্যই একটি স্পষ্ট লক্ষ্য থাকা উচিত, যেমন - CO₂ নির্গমন কমানো এবং সেই অনুযায়ী নির্মাণ কৌশলগুলো বিচক্ষণভাবে পরিবর্তন করা। বিশ্বব্যাপী মোট CO₂ নির্গমনের প্রায় ৩৭% আসে নির্মাণ প্রক্রিয়ার কারণে। তাছাড়া, আমাদের আরও অনেক ধরনের পরিবেশগত এবং বাহ্যিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা যে ধরনের স্থাপত্য বা ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন করি, সবক্ষেত্রেই আমাদের এই বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। সবশেষে, আমাদের কাজের মাধ্যমে সমাজে যে প্রভাব পড়ে তা নিয়েও চিন্তা করতে হবে।
|
| প্রতিবেদক: স্থপতি ফাইজা ফাইরুজ |