ঢাকায় চলছে ভাস্কর্যশিল্পের অগ্রদূত নভেরা আহমেদের বিশেষ প্রদর্শনী ‘নভেরা’

স্থাপত্য ও নির্মাণ
সাম্প্রতিক
১৪ জুলাই, ২০২৬
ঢাকায় চলছে ভাস্কর্যশিল্পের অগ্রদূত নভেরা আহমেদের বিশেষ প্রদর্শনী ‘নভেরা’

বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম বাংলাদেশী আধুনিক ভাস্কর নভেরা আহমেদের শিল্পকর্ম নিয়ে রাজধানী ঢাকায় ০৪ জুলাই ২০২৬ থেকে শুরু হয়েছে এক বিশেষ প্রদর্শনী। ‘নভেরা : Novera’ শীর্ষক এই অনন্য আয়োজনটি স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারীতে। আগামী ২১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০:৩০ টা থেকে বিকেল ৪:৩০ টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সকল দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই বিশেষ প্রদর্শনীতে নভেরা আহমেদের কালজয়ী ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম ছাড়াও তাঁর বর্ণিল শিল্পচর্চার দুর্লভ আলোকচিত্র এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের দ্রব্যাদি প্রদর্শন করা হচ্ছে।

743270252 1329542862667640 8181443783352466587 N

ভাস্কর নভেরা আহমেদের জীবন ও শিল্পকর্ম নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী ‘নভেরা’ (ছবিসত্ব: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর)

 

নভেরা আহমেদকে পূর্ব বাংলায় আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে মনে করা হয়। ষাটের দশকে যখন পূর্ব পাকিস্তানে প্রাতিষ্ঠানিক ভাস্কর্য শিক্ষার কোনো চল ছিল না, তখন ১৯৬১-৬২ সালে পাকিস্তানের জাতীয় শিল্প প্রদর্শনীতে তাঁর ভাস্কর্য প্রথম পুরস্কার লাভ করে। এরও প্রায় দুই থেকে তিন বছর পর ঢাকা আর্ট কলেজে ভাস্কর্য বিভাগ খোলা হয়। শিল্পকলার এক সহজাত প্রতিভা নিয়ে জন্মানো এই গুণী শিল্পী ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত হন।

নভেরা আহমেদের পৈত্রিক নিবাস চট্টগ্রামের আসকারদীঘির উত্তর পাড়ায়। সুন্দরবন অঞ্চলে কর্মরত পিতা সৈয়দ আহমেদের কর্মস্থল পরিবর্তনের সূত্রে তাঁর শৈশব কাটে কলকাতায় এবং তিনি কলকাতার লরেটো স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করেন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে সপরিবারে পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসে তিনি প্রথমে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনা করেন। এরপর ১৯৫১ সালে তিনি লণ্ডনের প্রখ্যাত ‘ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস’-এ ভাস্কর্য বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৫৫ সালে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন। এই শিক্ষা চলাকালীন ১৯৫৪ সালে প্রথিতযশা শিল্পী হামিদুর রহমানের সাথে ইতালির ফ্লোরেন্সে গিয়ে বিখ্যাত ভাস্কর ভেন্তুরির অধীনে ভাস্কর্যের পাঠ নেন তিনি।

১৯৫৬ সালে শিল্পী হামিদুর রহমানের সাথে ঢাকা ফিরে আসেন নভেরা। ১৯৫৭ সালে যখন বাংলাদেশের জাতীয় চেতনার প্রতীক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়, তখন হামিদুর রহমানের মূল সহযোগী হিসেবে নভেরা আহমেদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে এই কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। একই বছর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় এক শিল্পপতির বাসভবনে তিনি ‘কাউ অ্যান্ড টু ফিগার্স’ নামের একটি প্রাঙ্গণ ভাস্কর্য স্থাপন করেন। ১৯৬০ সালের ৭ আগস্ট তৎকালীন কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারে পাকিস্তান জাতিসংঘ সমিতি ও এশিয়া ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে তাঁর প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের আমন্ত্রণে তিনি লাহোর যান এবং ১৯৬১ সালের অল পাকিস্তান পেইন্টিং অ্যান্ড স্কাল্পচার এক্সিবিশনে তাঁর নির্মিত 'চাইল্ড ফিলোসফার' ভাস্কর্যটি প্রথম পুরস্কার লাভ করে।

 

740628626 1329542866000973 1391219268111274132 N

ভাস্কর নভেরা আহমেদের জীবন ও শিল্পকর্ম নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী ‘নভেরা’ (ছবিসত্ব: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর)

১৯৭০ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে এক আলোকচিত্রী বন্ধুকে সাথে নিয়ে ব্যাংকক যান এবং সেখানে একক প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। ওই বছরের শেষভাগে তিনি চিরতরে প্যারিসে পাড়ি জমান। ১৯৭৩ সালে প্যারিসে তাঁর একটি সফল ভাস্কর্য প্রদর্শনীর পর তিনি একপ্রকার স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান এবং জীবনের বাকি সময়ে ভাস্কর্যের চেয়ে চিত্রকর্ম তৈরিতেই বেশি মগ্ন থাকেন।

746067485 1329542596001000 4663196375214221092 N740722905 1329542739334319 3727362189431149000 N
743347389 1329542576001002 3802076218269902922 N743373632 1329542726000987 8003902308491953430 N
ভাস্কর নভেরা আহমেদের জীবন ও শিল্পকর্ম নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী ‘নভেরা’ (ছবিসত্ব: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর)

অবশেষে ২০১৫ সালের ৬ই মে, প্যারিসে প্রায় ৪৫ বছরের প্রবাসী জীবনের অবসান ঘটিয়ে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পের এই মহীরূহ। জাতীয় জাদুঘরে চলমান এই প্রদর্শনীটি নতুন প্রজন্মের কাছে আধুনিক বাংলার ভাস্কর্য ইতিহাসের এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীকে নতুন করে চেনার এক অনন্য সুযোগ করে দিয়েছে।


প্রতিবেদকঃ স্থপতি মুনিয়া আহমেদ মিম। 

আপনার মতামত দিন

কমেন্ট

Logo
Logo
© 2026 Copyrights by Sthapattya o Nirman. All Rights Reserved. Developed by Deshi Inc.