|
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী মুস্তফা মনোয়ার একাধারে ছিলেন চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, রেডিও পারফর্মার এবং চারুকলার অধ্যাপক। বাংলাদেশে পাপেট বা পুতুলনাট্যের চর্চা ও বিকাশে অসামান্য অবদান রাখার কারণে তাঁকে দেশের 'পাপেট ম্যান' বা পুতুলনাট্যের প্রধান অগ্রদূত হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৯৩৫ সালে প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তফা মনোয়ার। শৈশব থেকেই ছবির প্রতি তাঁর অন্যরকম ভালোবাসা ছিল, পাশাপাশি সংগীতও তাঁকে ভীষণভাবে আলোড়িত করত। শুরুতে বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হলেও, ভেতরের শিল্পীসত্তার টানে সেই পড়াশোনা ছেড়ে তিনি চারুকলায় যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি তাঁর মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
|
|
শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার (ছবিসত্বঃ শোকেস ম্যাগাজিন) |
শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার বাংলাদেশের গণমাধ্যম, শিল্পগবেষণা, নাট্যপরিচালনা এবং বিশেষ করে শিশুদের অনুষ্ঠান জগতের এক অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৯৬৭-৬৮ সালের দিকে টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'আজব দেশে'-র পরিকল্পক ও উপস্থাপক ছিলেন তিনি। এই অনুষ্ঠানে তাঁর সৃষ্ট 'বাঘা' ও 'মেনি' পাপেট চরিত্র দুটির মাধ্যমে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ব্যঙ্গাত্মক রূপে উপস্থাপন করা হতো।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর সংবেদনশীল মন ও দেশপ্রেম এক অনন্য মাত্রায় প্রকাশ পায়। শরণার্থী শিবিরের আতঙ্কিত ও মনমরা শিশুদের দেখে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হন এবং সেই দুঃসময়ে ওই শিশুদের মুখে একটুখানি হাসি ফোটানোর তাগিদ থেকেই সেখানে জীবনের প্রথম পুতুলনাট্যের আয়োজন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে তিনি নিরন্তর কাজ করে গেছেন।
|
|
১৯৬৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি শিশুতোষ অনুষ্ঠানে মুস্তফা মনোয়ার (ছবিসত্বঃ নন্দিনী মনোয়ার) |
|
তাঁর সৃজনশীল হাত ধরেই তৈরি হয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের সেই প্রতীকী লাল সূর্য, যার অন্যতম স্থপতি ছিলেন তিনি নিজেই। এছাড়া পাপেট শো-র মাধ্যমে তিনি ‘পারুল’-এর মতো জনপ্রিয় চরিত্র সৃষ্টি করেন এবং তাঁর নির্মিত পাপেট শো ‘মনের কথা’ সর্বস্তরের দর্শকের কাছে দারুণ সমাদৃত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিখ্যাত ‘মীনা’ কার্টুন তৈরির নেপথ্যেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। |
|
পাপেট শো ‘মনের কথা’ (ছবিসত্বঃ সোশ্যাল মিডিয়া ) |
|
শিশুদের প্রতিভা বিকাশের ঐতিহাসিক প্ল্যাটফর্ম ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানটি তিনি ১৯৬৬ সালে সীমিত পরিসরে সরাসরি সম্প্রচারের জন্য নির্মাণ করেন, যা স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সাল থেকে নিয়মিতভাবে প্রচারিত হয়ে দেশের শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক মনন গঠনে অনন্য ভূমিকা রাখে। শিল্প, সংস্কৃতি ও শিশুদের কল্যাণে এমন অনন্য সাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে ‘একুশে পদক’-সহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হন। আজীবন শিশুদের নান্দনিক বিকাশে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া এই মহান শিল্পীর অবদান বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে চিরকাল অম্লান ও চিরভাস্বর থাকবে।
|
শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার (ছবিসত্বঃ শোকেস ম্যাগাজিন) |
| প্রতিবেদকঃ স্থপতি মুনিয়া আহমেদ মিম |