লোকজ চিত্রকলাঃ আলপনা

স্থাপত্য ও নির্মাণ
শিল্পকলা
১ অক্টোবর, ২০২৬
১৩
লোকজ চিত্রকলাঃ আলপনা

লোকজ চিত্ররীতির আলোচনায় ছবির ধরণটাই মূখ্য হয়ে উঠে। অংকন শৈলীর দিক থেকে ভারতবর্ষে আলপনার কাছাকাছি আরও অনেক চিত্রশৈলী রয়েছে এবং স্থান ভেদে তাদের বিভিন্ন নামও রয়েছে। তবে বিষয়বস্তুর পটভূমি বিচারে আলপনা অনেকটাই আলাদা। আলপনার পরিচয় দিতে গেলে তাকে ‘রেখাচিত্র’ না ‘লেপন চিত্র’ সেই বিচার হয়ে যাওয়া খুবই দরকার। এই নামটির উৎপত্তি নিয়ে দুটি জোরালো মত রয়েছে। এক, আমাদের জমি ‘আইল’ কথাটি থেকে ‘আইলপনা’ এবং পরিবর্তিত হয়ে ‘আলপনা’। এই মতের মূল ভিতে রয়েছে জমির আইলের রৈখিক বৈশিষ্ট্য। জমির আইল বলতে বুঝি, জমির সীমানা নির্ধারণে ফসলের মাঝখান দিয়ে হাঁটা পথ, জমিতে জল আটকে রাখার জন্য বাঁধ ইত্যাদি। জমির সীমানা নির্ধারনের জন্য আইল অথবা শুস্ক মওশুমে জল ধরে রাখার জন্য আইল।

 
Whats App Image 2026 10 04 at 16.51.44
লেখকঃ স্থপতি কাজী আনিস উদ্দিন ইকবাল 

ছবি একেঁ জমির আকৃতি বোঝাতে গেলে কয়েকটি রেখা (যা বাস্তবে আইলের প্রতিরূপ) একে দেখানো যায়। এখানে একটা প্রশ্ন এসেই যায়, আলপনার শিল্পীরা সাধারণত; গ্রামের গৃহবধু, তারা জমির সীমানা নিয়ে খুব মাথা ঘামাতেন এমন সম্ভাবনা কম। তাছাড়া আলপনা কবে থেকে শুরু হয়েছে তার সাথে জমির মালিকানা বা সীমানা/আইল ইত্যাদি বাস্তব বিষয়ের কালানুগ সম্পর্ক কেউ মিলিয়ে দেয়নি। জমির আকৃতি স্বচক্ষে অনুধাবন করতে হলে উচু থেকে দেখা অথবা চারিপাশের মাপ বুঝে একটা ড্রইং করা চাই। আলপনার শুরুটা যে সময়কালে হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে তথ্য পাওয়া যায় তাতে ড্রইং করে বোঝার বিষয়টি গুরুত্ব হারায়। ধারণা করা যায় পূজা বিরোধী কিছু লোকের অনাবশ্যক আবিষ্কার এই ‘আইল থিওরী’। আলপনা আকাঁর নিকট অতীত পদ্ধতিতেও আঙুল দিয়ে চালের গুড়ার পিটুলি(গুড়ার দ্রবন) লেপে চিত্র তৈরি করার প্রমান মেলে। সংস্কৃতি শব্দ আলিম্পন (লেপা) থেকে বাংলায় আলপনা কথাটি উদ্ভূত হয়েছে বলে আরেক দল মনে করে।

Grety

জমির আইল হলো ফসলি জমির চারপাশের মাটির তৈরি উঁচু সীমানা

Alpona3

আলপনা

ব্রত

আলপনা মেয়েলী ব্রতের অংশ হিসেবেই সমাজে পরিচিত। এই বিষয়টি বুঝতে ‘ব্রত’ সম্মন্ধে ধারণা পরিষ্কার হওয়া দরকার। ব্রত এবং প্রচলিত দেব-দেবীর পূজা এক নয়। ব্রতের সূচনা হয় ব্যক্তিগত কোন আকাঙ্খা পূরণের তাগীদে। মানত করা বা পীরের দরগাহে শিরনি দেওয়ার মতো। নিজস্ব প্রার্থনা যে কোন অবস্থায়ই করা যায় কিন্তু ব্রতের কিছু নিয়ম গড়ে উঠেছে, সেগুলি বাদ দিলে ব্রত অসম্পূর্ণ থাকবে।

শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর; বাংলার ব্রত নামে একটি বই লিখে দেশের শিক্ষিত সমাজের কাছে ব্রত এবং পূজার পার্থক্য এবং সম্পর্কগুলো তুলে ধরেছেন। মানুষের নিজস্ব ক্ষমতার বাইরে অনেক আকাঙ্খা থাকে, সেসব চাওয়া পূরণের  জন্য সেই আদিকাল থেকে কোনো কাল্পনিক শক্তির কাছে প্রার্থনা করে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার প্রথা চলে এসেছে। রোগ মুক্তি, ধন-সম্পদ লাভ, সন্তান হওয়া, শত্রুনাশ, ভাল ফসল, ভাল বিয়ে এসব বড় বড় চাওয়ার সাথে ছোটো ছোটো স্বপ্ন পূরণ হওয়ার কোন প্রক্রিয়ায় কাল্পনিক প্রভাবশালী শক্তিকে আবাহন করা হতো, এই প্রক্রিয়াগুলিই ব্রত।

 

700x480 13227673 1007187479330288 3003888808493058335 O

ব্রতের আলপনা

Mit Cave Art Language 0 (1)

প্রাচীনকালে গুহার দেওয়াল আদিম মানুষের আঁকা শিল্পকর্ম

 

ব্রত শুধুমাত্র ভারতবর্ষে নয়, সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নানা ব্রত পালন করে আসছে। প্রাগৈতিহাসিক কালে যখন মানুষ দলবদ্ধভাবে গুহায় বাস করত। তখন শিকারে যাবার আগে বা পরে গুহার গায়ে পশুর ছবি একেঁছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা জানাচ্ছেন শিকারে চাহিদামতো পশু পাবার আশায় ঐ সব ছবি আঁকা হয়েছে। ছবি ছাড়াও হয়তো আগুন জ্বেলে তার চারদিকে ঘুরে ঘুরে নেচেছে। হয়তো কিছু দুর্বোধ্য হেয়ালীপূর্ণ ছড়া কেটেছে বা স্লোগান দিয়েছে বা মন্ত্র পড়েছে। এ সব করা হচ্ছে শিকার অভিযান সফল হবার জন্য — তাই এগুলো শিকারের ব্রত। তাহলে কোনো কাজের জন্য প্রস্তুতি নিলেই কি ব্রত হয়? পেন্সিল দিয়ে লিখতে গেলে পেন্সিলের মাথা কেটে সিস বের করতে হয়। লেখার প্রস্তুতি, কিন্তু তাকে ব্রত বলছিনা। কারণ এর সাথে কোনো অলৌকিক শক্তির সংযোগ কল্পনা করা হয় না। এগুলো নিতান্তই বাস্তব।

প্রাগৈতিহাসিক মানুষ বিশ্বাস করত প্রকৃতির সকল বস্তুর নিজস্ব প্রাণ আছে। কোন গাছ ইচ্ছা করলে হয়ত ছায়া বিস্তার করতে বা প্রচুর ফল দিতে পারে। পাহাড় গুহা তৈরি করে মানুষকে আশ্রয় দিতে পারে। সূর্য বা চন্দ্রকে তুষ্ট করলে তারা আলো দিবে। এই কল্পিত শক্তি ব্যক্তি বিশেষের ধারনা নয় বরং সমাজ স্বীকৃত। সমাজে বহুজনের বহুমত থাকলে বিশৃংখলা দেখা দেয় সে জন্য কিছু নিয়ম কানুন জারি করা হয়। এই রীতিনীতির পিছনে সেই অপার্থিব শক্তির স্বীকৃতি আছে বলে ধরে নেয়া হয়।

প্রতিটি মানুষের নিজস্ব মতামত থাকে, কিন্তু ব্যক্তিগত মত সকলের মত হিসাবে চালু করতে গেলে অন্যরা মানবে কেন? সে জন্য সকলের জন্য মঙ্গলজনক কিছু সাধারণ নিয়ম সমাজে চালু হয়েছে। সেই নিয়মগুলো সুরক্ষা করতে কিছু আনুসঙ্গিক কার্য-কলাপের আয়োজন করা হয়। যতই দিন যায় ওগুলোই প্রথা হয়ে দাঁড়ায়। আর এর সাথে যদি  কোন বিমূর্ত ধারনা যোগ হয় যেমন বিশাল বটগাছে কোনো অশরীরি আত্মা আছে যার কাছে শিরনি দিলে রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় — এ ধরনের গল্প বিশ্বাস করেই মানুষ দলে দলে বটগাছটিকে বিশেষ ভক্তি করতে শুরু করেছে। তার নিকটবর্তী হতে গেলে বিশেষ প্রস্তুতির আয়োজন তৈরি হয়েছে। সকলে হুড়োহুড়ি করে সেখানে যেন জড়ো না হয়, তারজন্য শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে। এভাবেই অপার্থিব অদৃশ্য শক্তির কাছে প্রার্থনা করার নানা তরিকা হয়েছে। ইচ্ছা পূরণের জন্য প্রার্থনা মনে মনেই করা যায়, কিন্তু এমন নিরিবিলি আকাংখার ফলাফল বাস্তব ক্ষেত্রে তেমন কোনো ফল বয়ে আনে না। নিজেকে একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়োজিত করতে পারলে ফলাফল যাই হোক অন্তত আমার চেষ্টা আমি করেছি বলে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়া যায়। ব্যক্তিগত অনুশীলন যখন সমাজের অন্যদের জন্যও পালনীয় হয়ে দাঁড়ায় তখন ব্রতের জন্ম হয়। সময়ের আবর্তনে এই ব্রত আয়োজনের দিক থেকে ফুলে ফেঁপে রীতিমতো আনুষ্ঠানিক পূজা-অর্চনার বৃহত কর্মযজ্ঞে পরিনত হয়।

75fbb7f751dcbed3164815928ce302106c41cLe Fleuve01 1
বিভিন্ন ধরনের ব্রত

সারা বিশ্বে সকল জাতির অতীতের সাংস্কৃতিক পটভূমি ঘাঁটলে নানা ধরণের ব্রত পাওয়া যায়। জীবন ধারনের উপায় ও স্থান-কাল ভেদে এই ব্রতগুলির আয়োজন ভিন্ন হলেও এসব পালনের মূল কারণ সেই আকাংখাগুলি খুবই কাছাকাছি এবং মৌলিক। ফসল, সন্তান, বিবাহ, বৃষ্টি, রোগ মুক্তি, সম্পদ কামনা ইত্যাদি বৃহত প্রতিষ্ঠিত ধর্মগুলির নানা পূজার আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে এই ব্রতগুলি মিশে গেছে। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে আর্যদের ধর্মের (হিন্দু) নানা পূজার মধ্যে সেই চিহ্নগুলো এখনও সুস্পষ্ট। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে আলপনা সদৃশ আরও অনেক চিত্ররীতি প্রচলিত আছে। স্থান ভেদে এবং ভাষার বিভিন্নতায় তারা নানা নামে পরিচিত। যেমন, উড়িষ্যায় ঝোটি , বিহারে আরিপন, রাজস্থানে মান্দানা, গুজরাটে সাথিয়া, মহারাষ্ট্রে রাঙ্গুলী, তামিলনাড়ু ও কেরালায় কোলাম ইত্যাদি।

Slide1
Slide2
Slide3

ব্রতের আনুষ্ঠানিকতা কেমনতর? একেক রকম আকাঙ্ক্ষার সাপেক্ষে ব্রত পালনের বিভিন্নতা রয়েছে। আগেই আলোচনা করেছি ব্রত শুধুমাত্র মানসিক আকুলতা প্রকাশ নয়, বাস্তব কর্মসূচির মাধ্যমে শর্তসাপেক্ষে সম্পন্ন করা। যেমন রোগ মুক্তির জন্য কেউ ৩ দিন উপোস করলো। গঙ্গা স্নান করল বা নতুন বউকে ঘরে তুলতে ঘরের দুয়ারে আলপনা দেয়া হলো, উলুধ্বনি দিয়ে কতগুলি ছড়াকাটা হল, ফুল-চন্দন দেয়া হলো ইত্যাদি। শুধু মাত্র ইশ্বরের কাছে প্রার্থনা নয়, সেই  কামনার জন্য নিজেদের বাস্তব অংশগ্রহণ চাই। মুসলমানরা হজ ব্রত পালন করেন। উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করে পাপ মুক্ত হওয়া। তারজন্য অনেকগুলি নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নিয়ম বা পদ্ধতি আলাদা কিন্তু উদ্দেশ্য কোন অদৃশ্য শক্তির অনুকম্পা লাভ করা। যে সমাজ যত পুরানো, সেখানে তত বেশি বৈচিত্রপূর্ণ ব্রত থাকতে পারে। বাংলাদেশে যে সব ব্রতে আলপনা দেয়া হয়, তার সাথে কিছু ছড়া কাটার প্রচলন রয়েছে। ছড়া ও ছবি একে অপরের সঙ্গী তবে আজকাল ছড়া কাটার মানুষ দুর্লভ, তাই ছবিই ভরসা। আধুনিক সমাজে অপার্থিব শক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া ক্রমশ কমে যাচ্ছে ফলে ব্রতগুলি কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকতায় পরিনত হচ্ছে।

ভারতবর্ষের বৃহৎ বঙ্গে, আর্য ধর্ম প্রবেশের আগে থেকেই নানা ব্রত চালু ছিল। কৃষিজীবি সমাজে এসব ব্রত প্রধানত মেয়েরা পালন করত। যেসব কাজে প্রচণ্ড শারীরিক শক্তি দরকার হয় না, সেগুলি মেয়েলী কাজ হিসাবে গণ্য করা হতো। যেমন, রান্না করা, গৃহস্থালী কাজ করা, শিশু পালন বা হাঁস-মুরগি পালন, গোবর মাটি দিয়ে ঘর ও উঠোন লেপা, সেলাই করা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তরি-তরকারির বাগান করা ইত্যাদি। এই হালকা কাজের সাথে বঙ্গের নারীরা সকল উৎসবেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। নারীর অংশগ্রহণে যে কোনো কাজ অনেকটাই রমনীয় হয়ে পড়ে, রুক্ষতা প্রশমিত হয়। আরেকটি বিষয় প্রায়শই যুক্ত হয় সে হলো ভাবালুতা। নারী সন্তান ধারণ করে, তার ভবিষ্যৎ কল্পনা করে। নিজের শরীরের মধ্যেই এক ধরনের বাসনার বাস্তব অংকুর লালন করে। শিশুর পালনের প্রতিটি পর্যায়ে তার কোমলতার বিষয়টি লক্ষ করলে তাদের গড়া শিল্পে স্বাভাবিক নমনীয়তার উৎস সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়।

আলপনা মেয়েলী ব্রত চিত্রকলা। এখানে দুটো শব্দ ‘মেয়েলী’ এবং ‘ব্রত’ একত্রে বলার কারণ রয়েছে। ব্রত পালনের প্রক্রিয়ায় ছবি আঁকা এক বিশেষ আয়োজন। শুধুমাত্র মনে মনে প্রার্থনা নয়, ব্রত পালনে কিছু বাস্তব কাজ করতে হয় চিত্ররচনা তার একটি। আলপনায় যে ফুল, লতা-পাতা, পাখী ও অন্যান্য প্রাণী আঁকা হয় সেগুলি শুধুমাত্র নক্সা করার জন্য নয়, এ মধ্যে অনেক প্রতীক থাকতে পারে। মানুষের আকাংখার সীমা নেই, কিন্তু আলপনার ছবিতে সচরাচর কিছু চিত্র বা প্যাটার্ন বার বার ফিরে আসে, সরল ভাবে দেখলে এসব চিত্রে যে জিনিসগুলো চিত্রিত হয়ে থাকে তাদের সংখ্যা সীমিত। আকাংখার বৈচিত্রের সাথে তাল মিলিয়ে নানা দৃশ্য অবতারণা হয় না। শিল্পী ব্রতের বিষয় বিবেচনা করে একটি মৌলিক রচনা করছেন না, বরং তার রপ্ত করা কতগুলি প্যাটার্নের নানা বিন্যাসের কাজটি সূচারুরূপে করতে পারলেই তিনি সফল। ব্রতের অন্যান্য উপাচারের সাথে এইসব নকশাগুলি একটি শৈল্পিক আবহ তৈরী করে। বারবার অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে যে ছবিগুলো আয়ত্তে এসেছে সেগুলি নানাভাবে সাজিয়ে যে নতুনত্ব আনা যায় শিল্পীর সৃজনশীলতার সুযোগ ওখানেই।

 Alpona Art 1

‘মেয়েলী’ শব্দটি আলপনার সাথে কেন উচ্চারিত হয়, সে নিয়ে কয়েকটি কথা বলা দরকার, ব্রত সাধারনত মেয়েলী আচার, ব্রত উপলক্ষে ছবি রচনা করছেনও মেয়েরা, সেজন্য ছবির আঙ্গীকে  ‘মেয়েলী’ কমনীয়তা স্পষ্ট। দৃঢ় সরল রৈখিক জ্যামিতিক আকৃতির বদলে ফুল-লতার অলংকরণ, শাঁখ, পাখি, পায়ের ছাপ ইত্যাদি ঘরোয়া প্রতীকের সমাবেশ। দেবালয় পূজা-আর্চনার বিশাল আয়োজনে সাধারণের অংশগ্রহনের সীমানা রয়েছে, অনুষ্ঠান প্রায় সবটাই পুরোহিত করেন, ভক্তরা অর্ঘ্য নিয়ে আসেন এবং পূজার শেষে প্রসাদ পান। পূজার আনুষঙ্গিক আয়োজনগুলি যেমন গান-বাজনা, নাচ, মেলা ইত্যাদি এমন জাক-জমকের সাথে হয় যে সকলেই আনন্দ অনুভব করেন। সে তুলনায় গৃহ-প্রবেশ, অন্নপ্রাশন, হাতেখড়ি, বধু বরণ ইত্যাদি নিতান্তই ঘরোয়া এবং বাইরের কাউকে দরকার পড়ে না। মেয়েরা আলপনা দেয় বলেই একে মেয়েলী বলা হচ্ছে না, ছবি রচনার কল্পনায়, বিন্যাসে এবং ঢঙে যে কমনীয়তা রয়েছে তাকে নারীর লীলায়িত ভঙ্গিমার সাথে তুলনা করা হয়।

Alpana06

পূজার আলপনা 

ক্ষণস্থায়ী চিত্র

আলপনা অস্থায়ী চিত্র, ব্রত যেমন অনির্দিষ্ট কাজের জন্য হয় না, যেমন এক মৌসুমে ভাল ফসলের বা কারও আশু রোগমুক্তির বাসনায় গৃহস্থ নারীরা ব্রত পালন করেন। ব্রতকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেবার জন্য যে আলপনা, সময় পার হয়ে গেলে তারও প্রয়োজন থাকে না। সে জন্যই আলপনা মেঝে বা উঠোনে দেয়া হয়। চালের গুঁড়ার মত অস্থায়ী উপাদান দিয়ে তৈরী হওয়ায় পায়ের ঘষায় কয়েকদিনের মধ্যেই ছবিটি বিলীন হয়ে যায়।  অন্যান্য ছবির মত আলপনার মাধ্যেমে এক ধরনের বার্তা প্রকাশিত হয়, যেন গৃহবধুরা বলতে চাইছেন তোমরা জেনে রাখ আমরা কিন্তু ব্রত পালন করছি; এই বার্তার একটা ভাষা আছে, বাংলার রমনীরা যুগে যুগে এই চিত্র ভাষা চর্চার মধ্য দিয়ে বার্তাগুলিকে সামাজিক পরিচিতি দিয়েছে। ব্রতিনী ব্রত অনুযায়ী কিছু প্রতীক সংকেত এঁকে তার মনোবাসনা প্রকাশ করেন। এই বার্তা হয়ত কোন অপার্থিব শক্তির কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা কিন্তু ছবি দেখছে বাস্তব মানুষেরা, তার ঘরের মানুষ, পাড়া প্রতিবেশী। আলপনা  দেবার সময়ে এই দর্শকদের তুষ্ট করার তাগীদ অনুভূত হওয়াই স্বাভাবিক।

Basics

ভিন্ন ভিন্ন ব্রতের ভিন্ন ভিন্ন আলপনা 

ঐতিহ্যগতভাবে আলপনা দেয়ার আয়োজন খুবই সাদামাটা। চালের গুঁড়া ভিজিয়ে একটি তরল দ্রবণ (পিটুলি) তৈরী করা হয়। এক টুকরা কাপড়ের উপর এই তরলটি ঢালা হয়। এরপর ঐ পিটুলি গোলাসহ কাপড়টি অনামিকা বা যে কোন আঙুলে এমনভাবে পেচিঁয়ে নেয়া হয় যেন আঙুলের মাথায় রঙের একটা ধারা প্রবাহিত হতে থাকে। কখনো কখনো কয়েকটি আঙুলও একত্রে ব্যবহার করা হয়। চালের গুঁড়া সাদা আর মাটির ঘরের মেঝে বা উঠোন যেখানে ছবিটি তৈরী করা হচ্ছে তার প্রাকৃতিক গাঢ় ছাই রঙের পটভুমিতে আলপনাটি শুকিয়ে গেলে ঝকঝকে একটা ছবি হয়ে উঠে। ছবি বড় হলে আগে খড়িমাটি দিয়ে একটা ড্রইং করে নেয়া হয়।

আলপনা রেখা ও বিন্দু নির্ভর হলেও রেখা সরু বা মোটা করা বা কোন অংশ ভরাট করা হয়। দক্ষ আলপনা শিল্পীরা খুবই জটিল চিত্র ও অলংকরণে পারদর্শী। তবে আলপনা সব সময়েই সাদা হয় না, কখনও কখনও কিছু প্রাকৃতিক রং পিটুলির সাথে যোগ করে ছবির কোন কোন অংশকে কিছুটা আলাদা গুরুত্ব দেয়া হয়। আধুনিক কালে আলপনায় নানা ধরনের রাসায়নিক রং ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং তুলি বা কলম আঙুলের স্থান দখল করেছে।

 
Whats App Image 2026 10 04 at 16.05.22
Whats App Image 2026 10 04 at 15.17.21
Puja Dukaan 1 13 400x267

 আলপনার আয়োজন 

রবীন্দ্রনাথ শান্তি নিকেতনে দেশের বিভিন্ন শিল্প ঐতিহ্য রক্ষার যে সব উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার মধ্যে আলপনা একটি। বাংলার গৃহবধুদের দক্ষ হাতে সৃষ্টি করা এই চিত্রধারা নতুনরূপে চর্চার জন্য সুদূর চট্টগ্রাম থেকে কয়েকজন শিল্পীকে নিয়ে এসেছিলেন। শান্তি নিকেতনের শিল্পালয়ে এই চর্চা নতুন রূপ নেয় এবং ব্রতের বাঁধন থেকে মুক্তি পায়। আলপনার এই নব জাগরণের দিকটি গভীরতর আলোচনার দাবী রাখে, সেজন্য সেই পর্বটি আরেকটি ভাগে তুলে ধরার চেষ্টা করব। 

Img 20220523 W A0008 1 768x765
Fb Img 1595001104943 1Bbbbrgr
বিশ্বভারতীতে আলপনা আঁকার অতীত ও বর্তমানের ছবি

ভারতবর্ষে প্রচলিত আরও অনেক লোকজ চিত্ররীতির সাথে আলপনার যথেষ্ট বাহ্যিক মিল রয়েছে। ছবির প্রতিকে, কম্পোজিশানে, শিল্পীদের সামাজিক অবস্থানেই বেশী মিল। অমিল উদ্দেশ্যে, স্থায়ীত্বে, ছবি তৈরীর মাল-মসলায়।

আলপনায় যে সব প্রতীক ব্যবহৃত হয়, বা ছবি তৈরীর সময়ে যে বিন্যাস চলে আসে তার কিছু পটভূমি থাকে। প্রথমত ব্রতটি কি বা কোন ধরনের। সন্তান কামনার ব্রত নিশ্চয়ই সম্পদ আকাংখার থেকে পৃথক হবে। হিন্দু  দেবী লক্ষীর আগমন প্রার্থনা করে পদচিহ্ন বা লক্ষীর বাহন পেচাঁ (অবশ্য বাংলার কৃষিজীবি পরিবারে ফসলের মাঠে রাতে ইদুর মারার জন্য পেচাঁ ও সাপকে ভক্তির চোখেই দেখা হয়), খাল-বিলে মাছ পাওয়ার সূত্রে মাছ বা নানা প্রকার পাখী, শঙ্খ, বিশেষ কোন লতা বা বৃক্ষ ইত্যাদি আঁকা হয়। এসব প্রতীকগুলির প্রমিত রূপ প্রচলিত আছে, তাই সকলেই বুঝতে পারে। স্থান বা এলাকাভেদে কিন্তু  বিশেষ প্রতীক আসতে পারে, এমনকি শিল্পী ইচ্ছা করেই ভিন্ন বিষয়ের সংমিশ্রন ঘটাতে পারেন।

Puja Dukaan 1 15 400x234
Puja Dukaan 1 17 400x234

 

Ewrefte

আলপনায় ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রতীক

আলপনা আঁকার কি নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন আছে ? এর সহজ উত্তর হয় না। আলপনায় সকলের পরিচিত কতগুলি প্রতীক থাকে যা ব্রতের উদ্দেশ্যের সাথে যুক্ত। আলপনার নির্দিষ্ট কোন পরিমাপ নেই, উঠোনে হলে বড় হবে, দোর গোড়ায় হলে ছোট হবে। তবে আলপনা চিত্রে প্রতীক গুলি বার বার আঁকা হয়, সেই সাথে অলংকরণের জন্য অনেক ফুল বা লতা সদৃশ মোটিফও থাকে। আলপনা চিত্র স্থান ভেদে সম্পূর্ণ আলাদা হয়না। বরং এদের মধ্যে আঙ্গীকে পার্থক্য খুঁজে বের করতে হয়। ইচ্ছামত আঁকা হয় না, উদ্দেশ্য অনুযায়ী ছবির আকৃতি আগেই ঠিক করা হয় এবং সামগ্রীক ভাবে ছবিটির মধ্যে জ্যামিতিক ও পৌনপুনিক চরিত্র বজায় থাকে।

Alpana015eeba0eb1f6791d1d30b8b6e9c0582421d7fa9957e17f9734614906f39fa6f13

আলপনা কাছে থেকে দেখার জন্য, সে জন্য এর আকার বিশাল হবার কোন কারন নাই। বর্তমান সময়ে আলপনা ব্যক্তিগত ব্রতের খোলস ত্যাগ করে ভিন্ন আঙ্গিকে গৃহীত হয়েছে। এই নয়া আলপনার আলোচনা প্রথাগত বা মেয়েলী চিত্র রচনার পটভূমিতে হবে না। আলপনাকে অনেকেই নকশার সাথে মিলিয়ে ফেলেন, দৃশ্যত এই দুইয়ের মাঝে অনেক মিল থাকলে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

 Comparison 

আলপনার ছবিকে শুধুমাত্র ছবি হিসাবে দেখতে গেলে তার মূল্যায়ন সমাজের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বাইরে শুধুমাত্র চোখে দেখার শৈল্পিক আয়োজন হিসাবেও মূল্যায়ন করা যায়। তখন প্রথার মধ্যে থেকেও বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ছবির বিন্যাসে শিল্পী যে স্বাধীনতা গ্রহন করেন তার স্বাদ গ্রহনের সুযোগ চলে আসে। এই ক্ষেত্রে আলপনার সৃষ্টিশীল সংবেদনশীলতা এবং প্রয়োজনে নতুন রূপ গ্রহন করবার সক্ষমতাই এই চিত্রধারাকে কালের প্রতিকুলে টিকে থাকার শক্তি যোগায়। 

আপনার মতামত দিন

০ কমেন্ট

Logo
Logo
© 2026 Copyrights by Sthapattya o Nirman. All Rights Reserved. Developed by Deshi Inc.