ভবিষ্যত বাংলাদেশের জন্য সর্বজনীন-স্বীকৃত পন্থায় ‘শহুরে সর্বজনীন প্রবেশ্যতা’ চালু করা

স্থাপত্য ও নির্মাণ
পরিবেশ ও পরিকল্পনা
২৮ জানুয়ারী, ২০২৪
৮৩
ভবিষ্যত বাংলাদেশের জন্য সর্বজনীন-স্বীকৃত পন্থায় ‘শহুরে সর্বজনীন প্রবেশ্যতা’ চালু করা

২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি প্রতিবন্ধী-অন্তর্ভুক্ত আধুনিক জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে শহরের স্থানগুলি এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রবেশ্যতা কেবলমাত্র একটি লক্ষ্য নয় বরং সমস্ত নাগরিকের জন্য একটি সত্যিকারের বাস্তবতা হিসেবে প্রকাশিত হবে।

যেহেতু বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী নগর উন্নয়নের যুগে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাই সর্বজনীন প্রবেশ্যতার প্রয়োজনীয়তা জাতীয় আলোচ্য বিষয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) এবং ১১ দ্বারা পরিচালিত প্রবেশ্যতার ব্যবস্থাগুলিকে একীভূত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি করেছে। বিশেষ করে যেগুলো সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর (UDD), আবাসন গণপূর্ত মন্ত্রনালয় দ্বারা সেরা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং নগর পরিকল্পনায় প্রবেশ্যতা ব্যবস্থার একত্রীকরণ একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেয়।

সর্বজনীন প্রবেশ্যতার উপর শহর-সংক্রান্ত নীতির বর্তমান অবস্থা:

সর্বজনীন প্রবেশ্যতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশের নগর নীতির প্রশংসনীয় অগ্রগতি দেখা যায়। নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর (UDD) নিরাপদ পানীয় জল, স্যানিটেশন এবং টেকসই নগরায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নগর পরিকল্পনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশ্যতার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা একটি বিশেষ অর্জন। সর্বজনীন প্রবেশ্যতার সাথে সম্পর্কিত নীতিগুলি এস.ডি.জি (SDG)-এর বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক পরিবেশ তৈরির নিশ্চয়তা দেয়।

বাংলাদেশে সর্বজনীন প্রবেশ্যতার সাথে সম্পর্কিত আইনী কাঠামো, সরকারী আইন, বিধি এবং নীতিগুলো অগ্রগতির ভিত্তি স্থাপন করেছে। টেকসই নগরায়নের উপর জোর দেওয়ার সাথে সর্বজনীন প্রবেশ্যতার বিষয়গুলো জড়িত, যার লক্ষ্য এমনভাবে শহরগুলো গঠন করা, যা একইসাথে অর্থনৈতিকভাবে প্রাণবন্ত থাকবে এবং সামাজিকভাবেও ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

 

সর্বজনীন প্রবেশ্যতার প্রতিবন্ধকতাসমূহ:

বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, লিঙ্গ অন্তর্ভুক্তি, পাবলিক স্পেস এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। প্রতিবন্ধী নারী, শিশু, ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি এবং পুরুষরা নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য তাদের একটি সংক্ষিপ্ত পদ্ধতির প্রয়োজন পড়ে।  শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা আরও একটি উদ্বেগের বিষয়, এক্ষেত্রে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

নীতিগত কাঠামো, নগর পরিকল্পনা, পরিবহন, বিল্ডিং ডিজাইন এবং সামাজিক সুরক্ষা পরিষেবাগুলোর সমস্যা সম্পূর্ণরূপে অন্তর্ভুক্ত নগর পরিবেশের প্রয়োজনীয়তাকে বাধা দেয়। যদিও কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এই সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে পূরণ করার জন্য, কিন্তু আরও বিস্তারিত এবং সমন্বিত পদ্ধতির প্রয়োজন।

 

জাতীয় পর্যায়ের প্রতিবন্ধকতা সুপারিশ:

নীতি সংশোধন: সর্বজনীন প্রবেশ্যতার সুস্পষ্ট বিধানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জাতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনাগুলোর একটি সমালোচনামূলক পর্যালোচনার প্রয়োজন৷ এর মধ্যে বিদ্যমান নীতিগুলো সংশোধন করা প্রয়োজন যেন সেগুলো স্পষ্টভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাহিদাগুলোকে সমাধান করে৷

আন্তঃমন্ত্রণালয় সহযোগিতা: মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে যৌথ প্রচেষ্টার পরিমাণ বৃদ্ধি করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সাথে সর্বজনীন প্রবেশ্যতা বাস্তবায়ন তত্ত্বাবধানে একটি কমিটি গঠন করা এই যৌথ প্রচেষ্টাকে সহজ করতে পারে। এটি নগর উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক পরিষেবার মতো বিভিন্ন খাতে করা উচিত।

জেলা পর্যায়ের প্রতিবন্ধকতা সুপারিশ:

আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত: জেলা-পর্যায়ের সমন্বয় সভাগুলিতে সক্রিয়ভাবে তাদের এজেন্ডায় সর্বজনীন প্রবেশ্যতার পদক্ষেপগুলো অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। জেলা প্রশাসক (ডিসি) স্থানীয় নীতিগুলি পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং এই বিষয়ে তাদের নেতৃত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে শহরের স্থানগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে।

সক্ষমতা বৃদ্ধি: বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ কর্মসূচী, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষমতা বাড়াতে পারে। সর্বজনীন প্রবেশ্যতার ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং সরঞ্জামগুলির সাথে তাদের পরিচিত করা এর অন্তর্ভূক্ত।

স্থানীয় অভিযোজন: জেলাগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানীয় চাহিদা মোকাবেলায় জাতীয় নীতিগুলো স্বনির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপজেলা পর্যায়ের প্রতিবন্ধকতা সুপারিশ:

সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা: উপজেলা পর্যায়ে পরিকল্পনা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। প্রবেশ্যতা নীতি প্রণয়নে স্থানীয় জনগণের চাহিদা এবং দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করা হয়।

সম্পদ বরাদ্দ: প্রবেশ্যতার ব্যবস্থার জন্য উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ অত্যাবশ্যক। এর মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সর্বজনীন প্রবেশ্যতা প্রচার করে এমন প্রোগ্রামগুলোর বাজেটের বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পৌরসভা পর্যায়ের প্রতিবন্ধকতা এবং সুপারিশ:

প্রবেশযোগ্য অবকাঠামো: সার্বজনীনভাবে অ্যাক্সেসযোগ্য শহুরে অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণ পৌরসভা পর্যায়ে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এটি শুধুমাত্র প্রবেশযোগ্য স্থান নির্মাণই নয় বরং তাদের চলমান রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করার সাথে জড়িত।

অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচি: পৌরসভার উচিত অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য নির্দিষ্ট কর্মসূচি চালু করা। এর মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা, দক্ষতা-নির্মাণ কর্মসূচী এবং উদ্যোগ থাকতে পারে।

ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রতিবন্ধকতা এবং সুপারিশ:

কমিউনিটি-ভিত্তিক পদ্ধতি: ইউনিয়ন পর্যায়ে সম্প্রদায়-চালিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। এর মধ্যে স্থানীয় সম্প্রদায়গুলিকে প্রবেশ্যতার উদ্যোগের মালিকানা নেওয়ার জন্য ক্ষমতায়ন করা এবং ইউনিয়নের নির্দিষ্ট চাহিদা মেটাতে তাদের প্রস্তুত করা জড়িত।

সচেতনতামূলক কর্মসূচী: ইউনিয়ন সম্প্রদায়ের মধ্যে লক্ষ্যভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচী পরিচালনা করা। এসব কর্মসূচী দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং অন্তর্ভুক্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখতে পারে।

এছাড়াও, যদিও বাংলাদেশ তার নগর নীতিতে সর্বজনীন প্রবেশ্যতাকে একীভূত করার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় অগ্রগতি করেছে, সেখানে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে যা পুনরায় বিবেচনা করা দরকার।

 

জাতীয় পর্যায়ে নীতি সংশোধন এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সহযোগিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক প্রবেশ্যতার জন্য স্থান তৈরি করতে পারে। জেলা, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রত্যেকেরই বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যার উপযুক্ত সমাধান হলো একটি বিস্তৃত এবং সমন্বিত পদ্ধতির উপর জোর দেওয়া। সামনের পথটি শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে না বরং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে উৎসাহিত করে। সচেতনতামূলক কর্মসূচী, কমিউনিটির অংশগ্রহণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি এই যাত্রার অবিচ্ছেদ্য উপাদান।

এই সুপারিশগুলো শহরের প্রবেশ্যতা তৈরির জন্য একটি মানচিত্র হিসেবে কাজ করে, যেখানে প্রবেশ্যতা কেবল একটি লক্ষ্য নয় বরং সমস্ত নাগরিকের জন্য একটি সত্যিকার বাস্তবতা, যা জাতির উন্নয়নের গতিপথে কাউকে পিছিয়ে রাখবে না।

মূল লেখা:

ডঃ খুরশীদ জাবিন হোসেন তৌফিক সাবেক পরিচালক, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর (UDD), গৃহায়ন গণপূর্ত মন্ত্রণালয় (MoHPW), গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

ডঃ প্রিয়াঙ্কা কোচার, বর্তমানে দ্য হ্যাবিট্যাট এম্প্রাইস, নিউ দিল্লির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, একজন গবেষক হিসেবে প্রায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি গবেষণা, শিক্ষা, শিল্পের সাথে জড়িত এবং অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে নির্মিত পরিবেশে স্থায়িত্বকে এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

A

ছবি: ডঃ খুরশীদ জাবিন হোসেন তৌফিক এবং ডঃ প্রিয়াঙ্কা কোচার

*** ‘সর্বজনীন প্রবেশ্যতা’ (Universal Accessibility): সর্বসাধারণের প্রবেশের সুযোগ করে দেয়া। 

বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী, ‘সর্বজনীন প্রবেশ্যতা’ দ্বারা সকল বয়সের এবং বিভিন্ন শারীরিক চাহিদাসম্পন্ন মানুষের প্রবেশের সুযোগ করে দেয়া বোঝানো হয়েছে।

যদিও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী, একে ‘সার্বজনীন গম্যতা’, অর্থাথ সার্বজনীন ডিজাইন নীতিতে নক্সাকৃত নির্মিত পরিবেশ বোঝানো হয়েছে।

সহকারি সম্পাদনায় : স্থপতি ফাইজা ফাইরুজ
নির্ণয় উপদেষ্টা লিমিটেড, পান্থপথ

আপনার মতামত দিন

কমেন্ট

Logo
Logo
© 2024 Copyrights by Sthapattya o Nirman. All Rights Reserved. Developed by Deshi Inc.