কুসুম্বা মসজিদ

স্থাপত্য ও নির্মাণ
ঐতিহ্য
৮ নভেম্বর, ২০২৩
১,৪১৫
কুসুম্বা মসজিদ

নঁওগার কুসুম্বা মসজিদ 
(বাংলার কালো রত্ন)

নির্মাণ সময়কাল : ১৫৫৮-৫৯ খ্রিস্টাব্দ

স্থান : নঁওগা, বাংলাদেশ

লেখক : স্থপতি আবু সাঈদ এম. আহমেদ

স্থপতি আবু সাঈদ এম. আহমেদ

প্রাচীন বাংলার দুই প্রাদেশিক রাজধানী পুন্ড্র বর্তমান বগুড়া ও বরেন্দ্র বর্তমান রাজশাহীর মধ্যবর্তী স্থানে আত্মগোপন করে আছে বাংলার কালো রত্ন নামে খ্যাত ছোট্ট একটি স্থাপত্য নিদর্শন। বগুড়া – নাটোর মহাসড়কের মধ্যবর্তী স্থানে এলে রাস্তার উত্তর পাশে অবস্থিত মসজিদটি কোন বাস যাত্রী বা পথচারীর চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না। কুসুম্বা নামক গ্রামে এ স্থাপনা অবস্থানের কারণে সকলের নিকট কুসুম্বা মসজিদ নামে পরিচিত। আয়তনে ছোট হলেও স্থাপত্য কৌশলের উৎকর্ষতার কারণে এ মসজিদটি সকল ঐতিহাসিকদের কাছে প্রাক মুঘল স্থাপত্যের মধ্যমনি হিসাবে পরিচিত। মসজিদের মধ্য প্রবেশ দ্বারের উপরিভাগে স্থপতি একটি শিলালিপি ফলকের অনুবাদ অনুযায়ী উক্ত মসজিদটি সুলতান গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ’র শাসন আমলে (৯৬৬ হি: / ১৫৫৪ – ৫৯ ইং সন) সুলায়মান নামক এক দানবীরের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মাণ হয়।

Bcf0fad8 C613 4742 B20d Abe3894b82b2

ছবি : কুসুম্বা মসজিদ

প্রতিটি দেশ বা অঞ্চলের স্থাপত্যশৈলী সেই ভৌগলিক অবস্থানে প্রাপ্ত উপাদান বা উপকরণ দ্বারা সৃষ্টি হয়। বাংলা একটি ব-দ্বীপ হওয়ার কারণে সর্বত্রই কাদামাটি পাওয়া যায়, যা ইট তৈরীতে ব্যবহার হয়। তাই প্রাচীন সভ্যতা পুন্ড্র নগর হতে শুরু করে অদ্যাবধী ইট বা পোড়া মাটি, বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যের উপকরণ হিসাবে সর্বজন স্বীকৃত।

এদেশে পাথর খুব দুষ্প্রাপ্য ছিল, তাই দেওয়ালের গাঁথুনিতে পাথরের ব্যবহার ও পদ্ধতি বাঙ্গালীর কাছে খুব অপরিচিত। মাঝে মাঝে পার্শবর্তী দেশ হতে পাথর আনা হতো যার ফলে পাথর দ্বারা দালান নির্মাণ ব্যয়বহুল ছিল। কিন্তু মুর্তি ও ভাস্কর্য তৈরীতে পাথরই ছিল প্রধান সম্বল, এ পাথর কষ্ঠি পাথর নামে পরিচিত। তবে সবচেয়ে মূল্যবান স্থাপত্য কর্মে কিছু কিছু পাথরের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় যা তাদের প্রাচুর্যতার বহি:প্রকাশ। যেমন মুঘলরা তাদের সবচেয়ে মূল্যবান সমাধী স্থাপত্যে নানা দেশ হতে দামী পাথর আমদানী করে ব্যবহার করতো। যুক্ত বাংলায় মাত্র ৬ টি মসজিদ পাথর দ্বারা তৈরী হয় তার মধ্যে একমাত্র কুসুম্বা মসজিদটি ছাদ ও দেওয়াল সহ সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় (সংস্কারকৃত) টিকে আছে কালের স্বাক্ষী হিসাবে।

এ মসজিদের দেওয়ালে ব্যবহৃত কষ্ঠি পাথর (Black basalt) গুলি বাংলার তদানিন্তন রাজধানী গৌড়-এর পার্শবর্তী প্রদেশ বিহারে রাজমহল নামক পাহাড় হতে সংগ্রহ করে নদী পথে উক্ত স্থানে আনয়ন করা হয়েছিল। সনাতন কষ্ঠি পাথরের চেয়ে এখানে ব্যবহৃত পাথরগুলির রং একটু গাঢ় ছিল।

Fa7316fb 9c1c 4636 Af79 6aca5625dbe1

ছবি : কুসুম্বা মসজিদ-এর ত্রিমাত্রিক ছেদচিত্র

বাংলায় গ্রামের বা একটি বসতি পত্তন শুরু হয় দীঘি খননের মাধ্যমে। দীঘি হতে প্রাপ্ত মাটি দিয়ে দীঘির চারপাশে তৈরী হতো উঁচু ভিটি ও ঘর-বাড়ী। পুকুরের পানি, মাছ চাষ ও দৈনিক গৃহস্থলী কাজে ব্যবহৃত হতো। এমনকি ধর্মীয় প্রয়োজনে এক পাড়ে বানানো হতো মন্দির বা মসজিদ। এই রীতি অনুসরন করে কুসুম্বা গ্রামে বিশাল এক দীঘির (যার দৈর্ঘ্য ৩৮১ মি: এবং প্রস্থ ২৭৪ মি:) পশ্চিম তীরে মসজিদটি অক্ষত অবস্থায় এখনও দাড়িয়ে আছে, চারপাশের বসত বাড়ীর অস্তিত্ব এখন আর নাই। দীঘির পশ্চিম পাড়ে ঠিক মধ্যবর্তি স্থানে বা অক্ষে ছোট সীমানা দেওয়াল দিয়ে মূল মসজিদটি ঘেরাও করে রাখা আছে। দক্ষিণ ও উত্তর দিক হতে ছোট খোলা গেইট দিয়ে মসজিদের সামনের খোলা চত্তরে প্রবেশ করা যায়। এ ধরনের চত্তরকে ইসলামী স্থাপত্যে অনাচ্ছাদিত শান (SHAN) হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। সাধারণত আরবদেশীয় শান ছিল প্রস্তর দ্বারা আচ্ছাদিত, কিন্তু বাংলার মসজিদের সামনের চত্বর ছিলো সবুজ ঘাঁষে আচ্ছাদিত। যা শুধু শুক্রবারের জুম্মা এবং দুই ঈদের নামাযের সময় ব্যবহৃত হয়। চারিদিকের নিচু সীমানা দেওয়াল একদিকে নামাযের স্থান হিসাবে ব্যবহার করার জন্য অন্যদিকে পবিত্রতা সংরক্ষণের সার্থে প্রাণীকুলকে বাধা প্রদান করত।

92dcdc68 484d 40e2 B433 C16206475f87

ছবি : কুসুম্বা মসজিদ-এর প্ল্যান

প্রাক মুঘল ইসলামী যুগের প্রথা অনুকরণে এই মসজিদটি ছিলো আয়তাকৃতি একটি চারদেওয়াল দিয়ে ঘেরা দালান। পরিসরের দেওয়ালের প্রস্থতা হলো ২.২৬ মি:। বর্তমানে মসজিদের অভ্যন্তরে পাথর দ্বারা আচ্ছাদিত। চারিপাশের দেওয়ালের নিচের স্তর বা পিলারের দৃশ্যমান ভিত্তি পাথর দেখে অনুমান করা যায় যে আসল মেঝের লেভেল বর্তমান লেভেল হতে উঁচুতে ছিলো। আভ্যন্তরীণ স্থান দুইটি বে (Bay) এবং তিনটি আইল (Aisle) দ্বারা ৬ টি সমান বর্গাকৃতি অংশে ভাগ করা হয়। এই পবিত্র স্থানটিতে পূর্ব দেওয়ালে অবস্থিত তিনটি প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করা যায়। তিনটি প্রবেশদ্বারের মাঝে মধ্যবর্তী দ্বারটি প্রস্থ ও উচ্চতায় অপেক্ষাকৃত বড়। যা মসজিদের কেন্দ্রিয় অক্ষকে সকলের চোখে দৃষ্টিগোচর করে। প্রত্যেক প্রবেশ পথ আবার তিনটি আর্চ বা খিলান দ্বারা গঠিত। মাঝের খিলানে লাগানো ছিল কাঠের তৈরী দুপাল্লার দরজা বা কপাট। যার উপর ও নিচের অংশ দেয়ালের সাথে লাগানো ছিল। পাল্লাগুলি Pivoted দরজা আদলে তৈরী করা ছিল। দরজার কাঠ খোলা অবস্থায় খিলানের অভ্যন্তরে লুকানো থাকতো। ফলে নামাজীদের চলাচলের সময় দরজার কপাট বাধার কারণ হত না। তবে উপরে পাথরের তৈরী রিং ও নিচের গর্ত করা পাথরের প্রমান ছাড়া দরজার কিছুই অবশিষ্ট নাই। উত্তর ও দক্ষিণ পার্শের দেওয়ালে প্রত্যেকটিতে ২ টি করে জানালা ছিল। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল উত্তর – দক্ষিণের মৌসুমী বাতাস চলাচলের সুযোগ করা একই সাথে আলো প্রবেশ নিশ্চিত করা। উত্তর ও দক্ষিণে দেওয়ালের জানালাগুলি একই অক্ষে যা কিবলা দেওয়ালের আড়াআড়ি, নামাজের কাতার সোজা তৈরী করার ব্যাপারেও সাহায্য করে। এ জানালাগুলি ছিদ্রযুক্ত পাথরের তৈরী গ্রিল দ্বারা বন্ধ করা ছিল। আলো-বাতাস নিরাপত্তাও নিশ্চিত করে। এসকল জানালাগুলির লিন্টেল-এর উপরিভাগ যাহা Tympanum নামে পরিচিত, পাথরের গাথুনি দ্বারা বন্ধ ছিল।

47b10a3f 8cf6 447b B463 6defbe64f36a

ছবি : অলংকৃত আর্চ

F61d2e55 578b 42bf B153 D6654362ab4c

ছবি : পাথরের স্তম্ভ

06afd66b B01e 4e0d 828c 784245332558

ছবি : কোণার দিকের ক্ষুদ্র গম্বুজ

কিবলামুখী বা পশ্চিমের দেওয়ালে অবস্থিত মিহরাবগুলি মসজিদের পূর্ব দেওয়ালে অবস্থিত প্রবেশদ্বারের একই অক্ষপথে বিদ্যমান। অর্থাৎ প্রবেশদ্বার দ্বারা মসজিদের ভিতরে প্রবেশের সাথে সাথেই সামনে সরাসরি মিহরাব বা NICHE দেখা যায়। পশ্চিমের দেওয়ালে তিনটি মিহরাব ছিল, কিন্তু ইসলামী অনুসারে ইমাম থাকে একজন, অতএব ১ টি মিহরাবই যথেষ্ঠ। তাই বহু মিহরাবের প্রচলনের প্রমাণ আরবীয় ইসলামী স্থাপত্যে পাওয়া যায় না। সুলতানী আমলে এই বহু মিহারাবের ব্যবহার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ঐতিহাসিকরা এ বহু মিহরাবকে বৌদ্ধ স্থাপত্যে বুদ্ধের জন্য তৈরী NICHE এর সাথে তুলনা করেছেন। বৌদ্ধমন্দিরে প্রতিটি প্রবেশদ্বারের বিপরীতেই একটি করে নিশ (NICHE) থাকে। এখানেও প্রতিটি প্রবেশদ্বারের বিপরীতে একটি মিহরাব। তবে মাঝের মিহরাব আয়তনে ও উচ্চতায় একটু বড়। এমনকি কেন্দ্রীয় মিহরাবটি বাহির হতে প্রাধান্য পাওয়া বা বুঝানোর জন্য শুধু এই অংশটুকুতে পুরু দেওয়াল বানানো হয়। মসজিদের ভিতরে দন্ডায়মান অবস্থায় চারটি পাথরের তৈরী পিলার দেখা যায়। যা ৬ টি অর্ধাগোলাকৃত গম্বুজ ও ছাদের ভার বহন করে। প্রতিটি পিলারের বেজ ও ক্যাপিটাল এর ডিজাইনে সাদৃশ্যতা লক্ষ্য করা যায়। আর মধ্যবর্তী অংশটুকু ১২ বাহু বিশিষ্ট বহুভুজ একটি মনোলেথিক পাথর হতে তৈরী। চারটি পিলার ও দেওয়ালে লুকানো আটটি পিলার, ইটের তৈরী খিলান দ্বারা একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে ছয়টি বর্গাকৃতি তৈরী করে, যা ৬ টি গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত।

                       E024d692 Ede4 4160 9c8b 743e0b286cd0

ছবি : কুসুম্বা মসজিদ-এর অভ্যন্তরীণ জায়গা

A6457706 A2c7 4709 B469 47b63e7e5ffc

 

ছবি : গম্বুজের ত্রিমাত্রিক অঙ্কন

 

গম্বুজগুলি চার দেওয়াল তলদেশ হলো বৃত্তাকার আর খিলান দিয়ে গঠিত স্থানটি হল বর্গাকৃত। এই বর্গাকৃত স্থানকে বৃত্তে রূপান্তরিত করার জন্য বাংলার স্থপতিরা এ বিশেষ ধরানের পেনটেনটিভ ব্যবহার করে। যা বাংলার স্থাপত্যে একটি নতুন সংযোজন। ইট দিয়ে হিন্দু স্থাপত্যের করবেলিং এবং মুসলিম স্থাপত্যের পদ্ধতির সংমিশ্রন এই বাঙ্গালী পেনডেনটিভ এর সুচনা হয়। পেনডেনটিভ দ্বারা গঠিত বৃত্তাকার স্থানের উপর ইট দ্বারা তৈরী হয় সৃষ্টি অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজ যার পুরুত্বের কোন পরিবর্তন নাই।

ছাদ হতে বৃষ্টির পানি সহজে ও দ্রুত নিষ্কাষণ করার লক্ষকে সামনে রেখে বাংলার স্থপতির এক নতুন ধরনের স্থাপত্যের বিকাশ ঘটায় যা বাঙ্গালীর স্থাপত্য বলে সারা বিশ্বে সমাদৃত। বাংলার এ সৃষ্টি কুড়ে ঘরের আদলে নির্মিত হয় স্থায়ী স্থাপত্যের বক্রাকৃতি কর্নিশ। ছাদে জমাকৃত পানি বক্রাকৃতির কারণে সহজেই উত্তর ও দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ছয়টি SPOUT দ্বারা নিষ্কাশিত হয়। মসজিদ স্থাপত্যেই নয় বরং সারা ভারতের হিন্দু, মুঘল ও ঔপনিবেশিক স্থাপত্যেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

মসজিদ স্থাপত্যে একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হলো মিনার, মিনার উৎপত্তির প্রধান তিনটি প্রয়োজন ছিল প্রথমত: উচ্চ স্থানে দাড়িয়ে আযান দেওয়ার জন্য, দ্বিতীয়ত অনেক দূর হতে মসজিদকে চিহ্নিত করার জন্য এবং সর্বশেষে সমাজের উপর ইসলামের আধিপত্যের বহি:প্রকাশের প্রয়োজনে।

বাংলায় মসজিদ পাড়া বা ছোট বসতির জন্য তৈরী হয়, তাই আযান সহজেই শোন যায়। অনেক দূর হতে হেটে মসজিদে আসে। ঘন বন জঙ্গল ও সমতল ভূমির দেশ বলে দূর হতে মিনার দেখার সুযোগ নাই এবং এদেশে ইসলাম প্রচার হয় শাসকদের দ্বারা নয় বরং সূফী, দরবেশদের দ্বারা। যাদের শক্তি প্রমানের প্রয়োজন ছিল না। উপরোক্ত ব্যবহাররিক প্রয়োজন না থাকায় বাংলার মিনারকে মসজিদ স্থাপত্যের একটি উপাদান হিসাবে গ্রহন করা হয় নাই। কিন্তু মিনারের পরিবর্তে বাংলায় মসজিদে কর্ণার TURRET তৈরী করা হয়। মসজিদের প্রত্যেক কর্ণারে একটি করে TURRET বসানো আছে। কুসুম্বা মসজিদেও চার কোণায় চারটি অর্ধভুজ আকৃতির কর্ণার TURRET লক্ষ্য করা যায়। যাকে অনেকগুলি ধাপে ভাগ করা হয়। এই টারেটগুলি মূল দেওয়ালের সমান উঁচু। কোথাও কোথাও ছোট একটি গম্বুজ দিয়ে ঢেকে পরিপূর্ণতা আনে। কুসুম্বা মসজিদে এই ছোট গম্বুজ বা CUPOLA অস্তিত্ব এখন নাই।

0d94124f 464c 405c 8473 82a5cb1faf0f

ছবি : কুসুম্বা মসজিদের বাহিরের দেয়াল

এই কুসুম্বা মসজিদে পরিলক্ষিত হয় ইসলামী স্থাপত্যের এক ব্যতিক্রমধর্মী নিদর্শন। মসজিদের উত্তর পশ্চিম কোণায় অবস্থিত একটি উচু প্লাটফর্ম যা নিচতলা হতে একটি একধাপ উচু বিশিষ্ট সিড়ি দ্বারা সংযুক্ত। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নিচতলায় নামাজ পড়তেন। সকল ঐতিহাসিকদের মতে এই উচু জায়গাটি মহিলাদের নামায পড়ার স্থান ছিল। ভারতের আহমেদাবাদের ইসলামী স্থাপত্যে এমন অনেক নিদর্শন আছে। তবে সেখানে উপরে উঠার সিড়ি ছিল মসজিদের মূল নামাযের জায়গা হতে বাইরে, যে কারণে সাধারণ পুরুষ নামাযী কখনও মহিলাদের উঠা-নামার সময় দেখতে পেত না। এমনকি সিড়ি ও দোতালার প্লাটফর্মটি চারিদিকে পাথরের তৈরী গ্রিল দ্বারা আবৃত ছিল সকলের দৃষ্টির আড়ালে নেওয়ার জন্য। কিন্তু কুসুম্বা মসজিদের এই প্লাটফর্ম আহমেদাবাদের মত জেনানা বা মহিলা গ্যালারী বলা যাবে না। কেননা এখানে পুরুষ নামাজিদের জন্য নির্ধারিত স্থানের মধ্য দিয়ে সিঁড়ি শুরু হয় এবং দোতলায় গ্রিল দ্বারা আচ্ছাদন করার কোন আলামতও খুজে পাওয়া যায় না। তাই এতে প্রতিপাদ্য হয় যে, এই স্থানটি হয়তো রাজা বা উচ্চ বংশীয় পুরুষ লোকদের জন্য নির্ধারিত স্থান ছিল। অবশ্য ইসলামী আদর্শ বিরোধী এ ধরনের ‘শাসকদের গ্যালারী’-র গুটি কয়েক প্রমান আছে তুর্কিতে কিন্তু বাংলায় এই একটি মাত্র শাসক গ্যালারী সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে। এই অক্ষত গ্যালারীর জন্য মসজিদ স্থাপত্যে কুসুম্বা একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে।

E57d5c42 9ce8 444f Afa0 2342bcb8a074

ছবি : উঁচু গ্যালারি

A16ed90c 434a 4df6 96e9 Aa726dbd412eবাংলায় বাঙ্গালীর স্থাপত্য ধারা বলতে আমরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী স্থাপত্য বা ইসলামী ও হিন্দু স্থাপত্যকে বুঝি। তারই মাঝে আবার সুলতানী শাসন আমলকেই বাংলার স্বর্ণযুগ বা রেনেসা বলে আখ্যায়িত করা হয়। এ সময়েই হয় বাংলা ভাষা প্রথম রাষ্ট্রভাষা। শিক্ষা, সাহিত্যে ও স্থাপত্যে অনেক অবদান এই সময়ে আর এভাবে তৈরী হয় বা শুরু হয় বাংলার মন্দির স্থাপত্য ধারা। আর এই কুসুম্বা মসজিদে পরিলক্ষিত হয় ইসলামিক সময়ের সকল বৈশিষ্ট সম্বলিত উপাদান যা ঐ সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন রাজাদের গ্যালারী, কর্ণার টারেট, বক্রাকৃতি কর্ণিশ, বাঙ্গালী পেনডেনটিড। বহু মিহরাব, পাথর, স্তম্ভ, সমতল গম্বুজ ইত্যাদি। আর উপসংহারে বলা যায় বাংলার সুলতানী স্থাপত্য ধারার জীবন্ত স্বাক্ষী বা প্রমান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে “কালো রত্ন” নামক এই মসজিদটি।

 

আপনার মতামত দিন

কমেন্ট

Logo
Logo
© 2024 Copyrights by Sthapattya o Nirman. All Rights Reserved. Developed by Deshi Inc.