স্থপতি স্মিলিয়ান রাদিচ ক্লার্ক (২০২৬ সালের প্রিৎজকার আর্কিটেকচার প্রাইজ বিজয়ী): ২য় পর্ব

স্থাপত্য ও নির্মাণ
ব্যক্তিত্ব
৩০ এপ্রিল, ২০২৬
স্থপতি স্মিলিয়ান রাদিচ ক্লার্ক (২০২৬ সালের প্রিৎজকার আর্কিটেকচার প্রাইজ বিজয়ী): ২য় পর্ব

স্থপতি সামান্থা লামিসা

স্থপতি স্মিলিয়ান রাদিচের কাছে স্থাপত্য কেবল জড় কাঠামো নয়, বরং জীবন্ত গল্পের মাধ্যম তিনি কোনো নির্দিষ্ট স্টাইলে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন না; তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করেন। এ কারণে তিনি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ - শহর, উপকূল বা পাহাড় - সব জায়গার প্রয়োজন অনুযায়ী সতর্কতার সাথে নকশা করতে পারেন। তাঁর কাজে আদিমতা ও আধুনিকতার যে সুন্দর মিশ্রণ দেখা যায়, তা সমকালীন স্থাপত্যে বিরল।

মেস্তিজো রেস্টুরেন্ট ২০০৬, সান্তিয়াগো, চিলি

 Radic 01 Mestizo 08 

সান্তিয়াগোর লাস আমেরিকাস পার্কে অবস্থিত ‘মেস্তিজো রেস্টুরেন্ট’ রাদিচের ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। ২০০৫ সালে একটি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। মেস্তিজো রেস্টুরেন্টটি লাস আমেরিকাস পার্কের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত, যেখান থেকে পার্কের বৈচিত্র্যময় ল্যান্ডস্কেপ দেখা যায়। রেস্টুরেন্টের বিপরীতে থাকা টিলা (Lookout Hill) এবং মাঝখানে জলবাগান (Water Gardens) রেস্টুরেন্টের জায়গাটিতে একটি অনন্য দৃশ্য তৈরি করে। আধুনিক ফুটপাত ও জলাধারের শান্ত পরিবেশে রাদিচের অমসৃণ পাথুরে কাঠামো পার্কের সঙ্গে এক অপার্থিব সমন্বয় তৈরি করেছে।

 Stringio (1)

প্রাথমিক ডিজাইনটি কর্তৃপক্ষ প্রত্যাখ্যাত করলেও রাদিচ তাঁর মূল ধারণা (Concept of Discontinuity) থেকে সরে যাননি। প্রথমে তিনি PVC মেমব্রেন ও গ্রানাইট পাথরের অস্থায়ী কাঠামো ভাবছিলেন, কিন্তু চূড়ান্ত ডিজাইনটিতে মেমব্রেনের বদলে কংক্রিট বিম ব্যবহার করা হয়, তবে পাথরের সেই আদিম ও অমসৃণ সার্ফেসগুলো অক্ষুণ্ণ রাখেন। সরাসরি খনি থেকে আনা বিশালাকার আন্দিজ গ্রানাইট পাথরগুলো ১১ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ স্প্যানকে স্তম্ভের মতো সাপোর্ট দিচ্ছে। এই প্রাকৃতিক পাথরগুলো একটি বেঞ্চযুক্ত ল্যান্ডফিলের ওপর এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যা ভবনের Vertical Load গ্রহণ করে। অন্যদিকে, ছাদের শক্ত কাঠামো ভূমিকম্পের সময় সৃষ্ট অনুভূমিক বলগুলোকে (Dynamic Horizontal Forces) পেছনের রিটেইনিং ওয়ালে স্থানান্তরিত করে।

Stringio (7)Stringio (2)Stringio (6)
 Stringio (8)Stringio (5)Stringio (4) 

Stringio

 

এই নকশায় রাদিচ বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি Sverre Fehn-এর প্যাভিলিয়ন এবং Lubetkin-এর ‘Highpoint II’- থেকে অনুপ্রেরণা নেন। Lubetkin তাঁর প্রজেক্টে এরেকথিয়ন মন্দিরের নারীমূর্তি (ক্যারিয়াটিড) ব্যবহার করেছিলেন, আর রাদিচও একই কৌশল অনুসরণ করে গ্রিক মূর্তির পরিবর্তে চিলির রুক্ষ গ্রানাইট পাথর ব্যবহার করেছেন। ‘Highpoint II’-এ মূর্তিগুলো যেমন বাগানের ঝোপঝাড় ও ফুলের সাথে মিশে গিয়ে ছাদের ভার বহন করছিল, মেস্তিজো রেস্টুরেন্টে এই পাথরগুলোও ঠিক তেমনি পার্কের ল্যান্ডস্কেপের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। পাথরগুলো এত নিখুঁত যে প্রথম দেখাতে বোঝা যায় না এগুলো ছাদকে সাপোর্ট করছে নাকি ছাদগুলো তাদের ওপর। এই দৃষ্টিবিভ্রম মেস্তিজোকে সাধারণ রেস্টুরেন্ট থেকে এক অনন্য স্থাপত্য-স্মারক বানিয়েছে।

 Stringio (3) 

 

                                                                     সার্পেনটাইন প্যাভিলিয়ন ২০১৪, লন্ডন, যুক্তরাজ্য

 Serpentine 

স্মিলিয়ান রাদিচের ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক হলো ২০১৪ সালে লন্ডনে নির্মিত সার্পেন্টাইন প্যাভিলিয়ন। ৩৫০ বর্গমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই আধা-স্বচ্ছ ডোনাট আকৃতির কাঠামো বিশাল পাথরের ওপর এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যেন তা ভাসমান। এটি কেবল স্থাপনা নয়, বরং ‘পার্ক নাইটস’ সিরিজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।

Inside of Serpentine 

এই অস্থায়ী প্যাভিলিয়নের নকশা রাদিচের পূর্বের কাজ থেকে অনুপ্রাণিত। মেস্তিজো রেস্টুরেন্টের মতোই এই প্যাভিলিয়নেও তিনি বিশালাকার পাথরের ভারবহন ক্ষমতা ও নান্দনিকতাকে প্রধান্য দিয়েছেন।

রাদিচের স্থাপত্যে মডেল ও বাস্তব কাঠামোর ফারাক কমে যায়। ‘ডিজিন’ (Dezeen)-কে তিনি জানিয়েছেন, এই প্যাভিলিয়ন যেন দূর থেকে একটি ‘বিশাল হাতে তৈরি মডেল’ (Giant Hand-made Model) মনে হয়। বড় প্রকল্পে যান্ত্রিক নিখুঁততার (Machine-cut precision) বদলে তিনি মানুষের স্পর্শ ও পাথরের প্রাকৃতিক টেক্সচার বজায় রেখেছেন, আর অমসৃণ পাথরের ওপর বসানো হালকা, আধা-স্বচ্ছ ডোনাট কাঠামো যেন স্টুডিওর ক্ষুদ্র মডেলের জীবন্ত প্রতিফলন।

 Serpentine Gallery Pavilion 7 1000pxSmiljan Radic Serpentine Pavilion 2014 

 

                                                      হাউস ফর দ্য পোয়েম অফ দ্য রাইট অ্যাঙ্গেল, ২০১৩, ভিলচেস, চিলি

 Capture 

চিলির ভিলচেসের গহীন বনাঞ্চলে স্থপতি স্মিলিয়ান রাদিচ নির্মাণ করেছেন ‘হাউস ফর দ্য পোয়েম অফ দ্য রাইট অ্যাঙ্গেল’। আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম ব্যক্তিত্ব লি কর্বুসিয়ের দর্শনের এক নির্জন প্রতিফলন এই বাড়িটি একইসাথে আদিম এবং আধুনিক। এই প্রকল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর ছাদে অবস্থিত তিনটি বিশালাকার Light wellঅদ্ভুত সব কোণে বিস্তৃত এই লাইট ওয়েল গুলো কেবল আলো প্রবেশের মাধ্যম নয়, বরং এগুলো আকাশ আর নির্জন বনের নিস্তব্ধতাকে ঘরের ভেতর বন্দী করার এক শৈল্পিক কৌশল।

বাড়িটি একইসাথে অন্তর্মুখী (Introverted) এবং ঊর্ধ্বমুখী (Vertical)। মাত্র ১২ সেন্টিমিটার পুরু রিইনফোর্সড কংক্রিটের দেয়াল একাধারে কাঠামো এবং নান্দনিকতা, উভয় ভূমিকা পালন করছেএই পাতলা দেয়ালগুলোর মাধ্যমেই স্মিলিয়ান রাদিচ তৈরি করেছেন বাঁকা দেয়াল (Curved walls), তীক্ষ্ণ সমকোণ এবং দুঃসাহসী সব ক্যান্টিলিভারের (Cantilever) এক জটিল অথচ সুশৃঙ্খল মিশ্রণ। পুরু দেয়াল বাইরের আবহাওয়া ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ করে ভেতরে স্থিরতা নিয়ে আসে। সবুজ অরণ্যের মাঝে কালো কংক্রিটের ঘরটি শুধু ঘর নয়, এটি হয়ে ওঠে স্থপতি রাদিচের সেই চিরাচরিত দর্শন যেখানে জ্যামিতি, আলো এবং প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। কালো কংক্রিটের শীতল কাঠামোর মাঝেও তিনি এক ধরণের ‘উষ্ণবোধ’ (Warmth) তৈরি করেছেন, যা কেবল একজন দক্ষ স্থপতির পক্ষেই সম্ভব।

 House of the Poem 1
House of the Poem 3

স্মিলিয়ান রাদিচের এই প্রকল্পের অদ্ভুত কাঠামোর মূল প্রভাব এসেছে লি কর্বুসিয়ের ১৯৫৩ সালের ‘দ্য পয়েম অফ দ্য রাইট অ্যাঙ্গেল’ সিরিজের ‘ফ্লেশ’ (Flesh) লিথোগ্রাফ থেকে। চিত্রের নারীদেহ, পা, পাথর ও হাতের ছাপকে রাদিচ দ্বিমাত্রিক থেকে ত্রিমাত্রিক স্থাপত্যে রূপান্তর করেছেন। জৈবিক ভাঁজ ও প্রতীকী চিহ্নগুলো এখানে লাইট ওয়েল, বাঁকা দেয়াল ও কংক্রিটের কাঠামোতে দেখা যায়। কালো কংক্রিটের এই শীতল কাঠামোর মাঝেও তিনি যে ‘উষ্ণবোধ’ (Warmth) তৈরি করেছেন, তা সমকালীন স্থাপত্যে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

House of the Poem 2
 House of the Poem 5House of the Poem4House of the Poem 6 

এ প্রকল্পটি কেবল একটি বাড়ি নয়, বরং চিত্রকলা ও স্থাপত্যের এক অনন্য সংযোগে রূপান্তরিত করেছে। বাংলাদেশি তরুণ ও উদীয়মান স্থপতিদের জন্য স্মিলিয়ান রাদিচের কাজ খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখিয়েছেন, স্থাপত্য কেবল কঠিন কাঠামো নয়, বরং সময়ের সাথে বদলানো এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা। তাঁর কাজে দেখা যায়, বড় পাথর ও আধুনিক ফাইবারগ্লাস একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। তিনি প্রমাণ করেছেন, বিশ্বখ্যাতি নয়, বরং গভীর একাগ্রতা ও উপকরণের সততা প্রয়োজন। স্মিলিয়ান রাদিচের ‘ভঙ্গুর স্থাপত্য’ মনে করিয়ে দেয় যে, স্থাপত্যও মানুষের মতো নশ্বর, আর এই নশ্বরতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সৃজনশীলতার সৌন্দর্য ২০২৬ সালের প্রিৎজকার জয় শুধু তাঁর নয়, বরং সেই গভীর ও নিভৃতচারী চিন্তার স্বীকৃতিও, যা স্থাপত্যকে কেবল হিসাবের বস্তু থেকে জীবনের স্পন্দনে রূপান্তর করেছে।  

 G 

 

আপনার মতামত দিন

কমেন্ট

Logo
Logo
© 2026 Copyrights by Sthapattya o Nirman. All Rights Reserved. Developed by Deshi Inc.