|
স্থপতি সামান্থা লামিসা স্থাপত্য কি শুধু ইট-পাথরের গড়া স্থির কিছু, নাকি সময়ের সঙ্গে বদলানো এক অনুভূতি? ২০২৬ সালের Pritzker Architecture Prize বিজয়ী চিলির স্থপতি স্মিলিয়ান রাদিচ ক্লার্ক (Smiljan Radic Clarke) আমাদের এই প্রশ্নটাই ভাবতে শেখান। তার নকশা করা ভবনগুলো যেন জীবন্ত শিল্পকর্ম - যেখানে ভারী পাথরের সঙ্গে হালকা কাঁচ বা ফাইবারের মিশ্রণ দেখা যায়। তিনি প্রচলিত স্থাপত্যের নিয়ম ভেঙে ‘ভঙ্গুর কিন্তু শক্তিশালী’ এক নতুন ভাবনা তুলে ধরেছেন। |
|
ব্রোঞ্জ পদক |
|
এই পুরস্কারটি স্থাপত্য জগতের অন্যতম সম্মানজনক পুরস্কার, যা ১৯৭৯ সাল থেকে দেওয়া হচ্ছে। ১৯৭৯ সালে শিকাগোর প্রখ্যাত প্রিৎজকার পরিবার (জে এ প্রিৎজকার ও সিন্ডি প্রিৎজকার) তাদের ‘হায়াত ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে এই পুরস্কার চালু করেন। স্থাপত্য জগতের ‘নোবেল’ নামে পরিচিত এই সম্মাননা প্রতি বছর এমন জীবিত স্থপতি বা স্থপতিদের দেওয়া হয়, যাদের কাজে বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা এবং দায়িত্ববোধ একসঙ্গে দেখা যায়। |
|
|
|
২০২৬ সালের Pritzker Architecture Prize বিজয়ী হিসেবে চিলির স্থপতি স্মিলিয়ান রাদিচ ক্লার্ক -এর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। জুরি বোর্ডের মতে, তিনি তাঁর কাজে ‘ভঙ্গুরতা ও শক্তির সুন্দর মেলবন্ধন’ দেখানোর জন্য এই সম্মান পেয়েছেন। তিনি প্রচলিত ধারার বাইরে কাজ করেন এবং প্রতিটি প্রকল্পকে নতুনভাবে ভাবেন। তার নকশায় পাথরের খসখসে ভাব ও আধুনিক স্বচ্ছ উপকরণের মিশ্রণ স্থাপত্যের পুরনো ধারণাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে। তিনি দেখিয়েছেন - স্থাপত্য শুধু বড় বা জাঁকজমকপূর্ণ হলেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, ছোট ও সাধারণ কাজও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তার কাজের মূল ভাবনা হলো - স্থান নিজেই কথা বলুক। তার ভবনগুলো শান্ত, সহজ এবং অনুভব করার মতো। তার স্থাপত্য আমাদের শেখায় - স্থাপত্য শুধু দেখার বিষয় নয়, বরং অনুভব করার একটি মাধ্যম। |
|
'স্থাপত্য ও নির্মাণ' - এর পাঠকদের জন্য এ পর্যায়ে আমরা বিশদভাবে জানার চেষ্টা করব কে এই স্মিলিয়ান রাদিচ ক্লার্ক এবং কেন তাঁর কাজ বর্তমান সময়ের স্থাপত্য ভাবনায় এত গুরুত্বপূর্ণ ? স্মিলিয়ান রাদিচ ক্লার্ক (জন্ম ১৯৬৫, সান্তিয়াগো) চিলির একজন সমসাময়িক স্থপতি, যাঁর কাজ বিশ্বজুড়ে 'রহস্যময়' এবং 'ভাস্কর্যধর্মী' হিসেবে সমাদৃত। তার স্থাপত্য যেমন কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় আবদ্ধ নয়, তার জীবনও তেমনি অজস্র অভিজ্ঞতার পলি জমে গড়ে ওঠা এক সুশৃঙ্খল আখ্যান। তার কাজে আমরা যে গতিশীলতা, উন্মুক্ততা এবং পর্যায়ক্রমিক অর্থের সন্ধান পাই, তার ভিত্তি রচিত হয়েছে তার যাপিত জীবনের পরতে পরতে। সান্তিয়াগোতে বড় হওয়া এই স্থপতির রক্তে মিশে আছে বৈচিত্র্য, বাবার দিক থেকে ক্রোয়েশীয় আর মায়ের দিক থেকে তিনি ব্রিটিশ উত্তরাধিকার। কিন্তু রাদিচ নিজেকে কেবল এই উত্তরাধিকারের বাহক হিসেবে দেখেননি; বরং জীবনকে দেখেছেন একটি 'সংযোজিত শিল্প' (additive process) হিসেবে। অন্তর্ভুক্তি আর আত্মপরিচয়ের এই নিরন্তর দহন থেকেই তার সেই কালজয়ী উপলব্ধি: "মাঝে মাঝে নিজের শিকড় নিজেকেই রোপণ করে নিতে হয়। আর সেই স্ব-নির্মিত শিকড়ই আপনাকে দেয় অবারিত সৃজনশীল স্বাধীনতা।" |
|
স্মিলিয়ান রাদিচ ক্লার্ক (Smiljan Radic Clarke) স্মিলিয়ান রাদিচ ক্লার্ক (জন্ম ১৯৬৫, সান্তিয়াগো) চিলির একজন সমসাময়িক স্থপতি। তার কাজ বিশ্বজুড়ে ‘রহস্যময়’ ও ‘ভাস্কর্যের মতো’ হিসেবে পরিচিত। তার স্থাপত্য কোনো নির্দিষ্ট ধারায় বাঁধা নয়; তার জীবন ও নানা অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে উঠেছে। তার কাজে গতি, উন্মুক্ততা ও নতুন ভাবনার প্রকাশ দেখা যায়, যা তার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই এসেছে। তার কালজয়ী উক্তি: "মাঝে মাঝে নিজের শিকড় নিজেকেই রোপণ করে নিতে হয়। আর সেই স্ব-নির্মিত শিকড়ই আপনাকে দেয় অবারিত সৃজনশীল স্বাধীনতা।" |
|
|
স্মিলিয়ান রাদিচের কাছে স্থাপত্য কেবল জড় কাঠামো নয়, বরং জীবন্ত গল্পের মাধ্যম। ১৯৮৯ সালে চিলির পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি ইতালির ভেনিসে Università IUAV di Venezia-তে স্থাপত্যের ইতিহাসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখানে ইউরোপীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক স্থাপত্যের মেলবন্ধন তাঁর চিন্তা ও কাজে গভীর প্রভাব ফেলে। রাদিচ একজন স্থপতির পাশাপাশি নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। তিনি চিলির পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি, হার্ভার্ড GSD এবং ETH Zurich-এ অতিথি শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর কাছে স্থাপত্য শুধু পেশা নয়, বরং ধারাবাহিক জ্ঞানচর্চা। তাই কাজের মান বজায় রাখতে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের স্টুডিওর পরিধি ছোট রেখেছেন, যাতে প্রতিটি প্রকল্পে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিবিড় সময় দিতে পারেন। |
|
|
|
|
স্মিলিয়ান রাদিচের বেশিরভাগ কাজ চিলিতে হলেও এর ভাবনাগুলো সব জায়গার জন্য প্রাসঙ্গিক। তাঁর কাজের ধরনও বেশ বৈচিত্র্যময় - সান্তিয়াগোর ‘মেস্তিজো রেস্টুরেন্ট’-এর মতো পাবলিক স্পেস থেকে শুরু করে ‘কপার হাউস ২’-এর মতো ব্যক্তিগত বাড়ি এবং ‘চারকোল বার্নার্স হাউস’-এর এক্সটেনশনের মতো সূক্ষ্ম কাঠামোও তিনি নকশা করেছেন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট স্টাইলে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন না; তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করেন। এ কারণে তিনি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ - শহর, উপকূল বা পাহাড় - সব জায়গার প্রয়োজন অনুযায়ী সতর্কতার সাথে নকশা করতে পারেন। তাঁর কাজে আদিমতা ও আধুনিকতার যে সুন্দর মিশ্রণ দেখা যায়, তা সমকালীন স্থাপত্যে বিরল। |
|
|
|
|
|
সার্পেন্টাইন গ্যালারির সাবেক পরিচালক জুলিয়া পেইটন-জোন্সের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে রাদিচ তাঁর কাজের দৃষ্টিভঙ্গি এমনভাবে তুলে ধরেছেন: "আমার প্রকল্পগুলো চূড়ান্ত পর্যায়ে হয়তো কোনো অদ্ভুত রূপ বা জ্যামিতিক আকৃতি নিতে পারে, কিন্তু আমার কাজের শুরুটা হয় সবসময় উপকরণ (Material) এবং তার ‘টেকটোনিক্স’ (Tectonics) নিয়ে। একটি নির্দিষ্ট অবয়বে উপকরণগুলো কীভাবে আচরণ করবে, সেটিই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমার প্রতিটি মডেল অত্যন্ত অভিব্যক্তিমূলক (Expressive); আমি মডেলের মাধ্যমেই এটি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি যে, মূল নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক কেমন হবে।" রাদিচ শুধু সুন্দর নকশা তৈরি করেন না; তিনি উপকরণ ও নির্মাণ পদ্ধতির দিকগুলোকে সৃজনশীলতার মূল হিসেবে দেখেন। তাঁর মডেলগুলো শুধু ভবনের ছোট সংস্করণ নয়, বরং নিজেই একটি স্বকীয় শিল্পকর্ম, যা ভবনের রূপরেখা প্রকাশ করে। একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ বিষয় হলো, বিশ্বের প্রভাবশালী স্থপতি হলেও স্মিলিয়ান রাদিচের স্থাপত্য ফার্মের কোনো অফিসিয়াল ওয়েবসাইট নেই। তিনি সচেতনভাবে ‘লো ডিজিটাল প্রোফাইল’ বজায় রাখেন এবং ভার্চুয়াল জগতের চেয়ে সান্তিয়াগোর তাঁর ভৌত স্টুডিওকে অগ্রাধিকার দেন। তাঁর স্টুডিও শুধু অফিস নয়, বরং একটি গবেষণাগার, যেখানে তিনি নিভৃতে কাজের গভীরতা ও উপকরণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ বজায় রেখে স্থাপত্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। |