|
প্রকল্প তথ্য প্রকল্পের নাম: খান জাহান আলী হলঅবস্থান: গল্লামারী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা ক্লায়েন্ট: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ কাল: ১৯৯০ সাল থেকে ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর নির্মাণ ব্যয়: প্রায় ৩,৬০,০০,০০০ টাকা আয়তন: ৬০,০০০ বর্গফুট উপদেষ্টা: শেলটেক (প্রাঃ) লিঃ ও নির্ণয় উপদেষ্টা লিঃ স্থপতি: মাহবুবুল মালিক, কাজী আনিস উদ্দিন ইকবাল স্ট্রাকচারাল ডিজাইন: ড: হোসেন আলী, ডঃ তৌফিকুল আনোয়ার, বি.আর.টি.সি প্লাম্বিং ইঞ্জিনিয়ার: প্রকৌশলী আসদুজ্জামান ইলেকট্রিকাল ডিজাইন: ড: রিয়াজুল হামিদ |
|
পৃথিবীর তাবৎ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্থাপত্যশিল্প নিয়ে যখন হৈ চৈ ওঠে, যখন কাড়াকাড়ি পড়ে যায় খ্যাতির গন্ডী মাপতে মাপতে, তখন পৃথিবীর এক কোনায় ছাপোষা অবয়বে পড়ে থাকা আমরা বাংলাদেশীরা শুধু অদূরদৃষ্টির হাত ধরে দীর্ঘশ্বাসই ফেলি। কখনও উপলব্ধি করার সুযোগ পাইনা নিজেদের স্থাপত্য ধরার চালচিত্রকে। আধুনিক স্থাপত্য চর্চায় বাংলাদেশ বাধাহীন সমুদ্র পাড়ি দিতে না পারলেও এর প্রাথমিক উৎকর্ষ সাধনে তরী ভাসাতে পিছপা হয়নি এদেশের স্থপতিরা। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। উন্নয়নের হাল ধরে এদেশের স্থপতিরা যেসব কীর্তি রচনা করেছেন বা এখনও করে যাচ্ছেন সেগুলি এদেশের পটভূমিতে কতটুকু অবদান রেখেছে বা রাখছে তা মাপার জন্য আজকের আলোচনা নয় বরং এদেশের স্থপতিদের চিন্তার ভাবমূর্তিকে সাধারণ মানুষের মাঝে তুলে ধরাই উদ্দেশ্য। |
|
পাখির চোখে 'খান জাহান আলী হল' (ছবিস্বত্ব: Mrb Niloy) |
|
| খুলনা থেকে প্রায় ৪ কি.মি. দূরে ছায়াঘেরা একটি সুনিবিড় পরিবেশ নিয়ে বিস্তৃত হয়ে আছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রহোস্টেল ‘খান জাহান আলী হল' । বিস্তীর্ন সবুজ ধান ক্ষেতের মাঝখানে দাড়িয়ে থাকা ছাত্র হলটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্থাপত্যিক নিদর্শনরুপে বর্তমানে দাড়িয়ে আছে। কঙ্কাল কাঠামোর (Skeleton Structure) এই হোষ্টেল ভবনটি পোষ্ট লিনটেল বা বীম কলাম কাঠামোর একটি আদর্শ দৃষ্টান্তরূপে শিক্ষানবীশ স্থপতিদের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে সাহায্য করবে। সবচেয়ে বড় কথা বসবাসের জন্য এমন একটি আঙ্গিক দরকার, যা মানুষের প্রতিনিয়ত চলতে থাকা একঘেয়েমির অভিশাপ থেকে দূরে রাখে। চার তলা বিশিষ্ট এই হোষ্টেলটি এমন এক পরিবেশ হিসেবে ছাত্রদের কাছে আবির্ভূত হয়েছে যা কিনা শুধু একঘেয়েমির অভিশাপমুক্ত নয়, এটি বাংলাদেশের হোষ্টেল স্থাপত্যের ইতিহাসে নিয়ে এসেছে নতুন মাত্রা। |
|
যে কোন হোষ্টেল ভবনের গতানুগতিক আঙ্গিক (FORM) নিয়ে আলোচনায় বসলে চোখে ভেসে ওঠে একটি লম্বা করিডোর এর একপাশে অথবা দু'পাশে সারি সারি রুম। সেখানে অক্ষ (axis) পরিবর্তনের মাধ্যমে কোন সার্কুলেশন প্যাটার্ন বা চলাচল পথ নেই। দুই বাহু বিশিষ্ট চারতলা এই ছাত্রহলটিতে চলাচল পথে অক্ষের পরিবর্তনের সাথে সাথে রয়েছে কয়েকটি ব্রীজ কানেকশন যা কিনা ভবনটির দু'বাহুর মধ্যে পুরোপুরি সংযোগ স্থাপন করে। |
|
হোস্টেল ভবনটির নকশা(plan) পর্যালোচনায় প্রথমেই চোখে পড়ে এর মাঝখানে অবস্থানরত Courtyard যা কিনা প্রস্তাবনার শুরুতে Semi paved হবার কথা ছিল। বর্তমানে এটি শুধু ঘাস আর মাটি দ্বারা পূর্ণ। শীতের আমেজ শুরু হলে ছাত্ররা এখানে ‘ব্যাডমিন্টন' খেলে। স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে খেলাধূলার ব্যাপারে হোস্টেল ভবনটি বেশ কার্যকরী। বিকেল বেলায় চারতলার করিডোরে দাঁড়ালে নীচে দেখা যায় বিভিন্ন লেয়ারে টেরেস ও ব্রীজে ছাত্রদের স্বতঃস্ফুর্তার বহিঃপ্রকাশ। এখানে টেরেস, করিডোর ও ব্রীজগুলো অনেকটা গ্যালারীর মত কাজ করে। |
|
|
|
|
বেশ খোলামেলা পরিবেশে অনেকাংশ খোলামেলা পরিসরের আলোকে রচিত খানজাহান আলী হলে বর্ষায় পানির বেশ ছড়াছড়ি দেখা যায়। এসম্বন্ধে স্থপতির মূলনীতি (concept) হচ্ছে অল্প কিছুদিনের সমস্যার জন্য বড় সমস্যা ডেকে আনার দরকার নেই। বরং আমরা এই অল্প কিছু দিনের বর্ষাকে গ্রহন করে নিলেই এই খোলামেলা পরিসরের স্বতঃস্ফুর্ততা উপভোগ করতে পারব। হোস্টেল ভবনটির কোর্টইয়ার্ডটি লাইট ওয়েল বা আলোর উৎস হিসেবেও কাজ করছে। এছাড়াও এই কোর্ট ইয়ার্ডটির মাপ বা স্কেল এমনভাবে নির্ধারিত যা কিনা ছাত্রদের মাঝে যোগাযোগ বাড়াতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। বায়ু প্রবাহের ব্যাপারেও কোর্টইয়ার্ডটি যথেষ্ট উপযোগী। বাতাস এক কোনা থেকে ভবনটিতে প্রবেশ করে এবং এই কোর্টইয়ার্ডটির মাধ্যমে তা সবদিকে ছড়িয়ে অন্যদিক দিয়ে বের হয়ে যায়। |
|
|
|
|
|
বীম কলাম কাঠামোতে তৈরী এই হোস্টেল ভবনটি প্রকাশের দিক থেকে কঙ্কাল কাঠামোর (Skeleton Structure) পরিচয় দেয়। ভবনটিতে প্রযোজিত উন্মুক্ত কলাম এবং বীম একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্রেম বা কঙ্কাল কাঠামোর কথা বলে। সুতরাং কাঠামোগত প্রকাশের কথা উঠলেই প্রথমেই আমরা এর সততার পরিচয় পাই। হোস্টেলটির করিডোর ধরে হাটতে গেলে দেখা যায় বীম এবং কলাম গুলো করিডোরের উন্মুক্ত পাশ থেকে বের হয়ে ফ্রেমের আকৃতিতে ছাদগুলিকে ধারণ করছে। ব্রীজ গুলোকেও ঐ একই ভাবে ফ্রেমের মাধ্যমে ধরে রাখা হয়েছে। নান্দনিকতার বিচারে এসব ফ্রেম বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখে কারণ এগুলোতে দিনের বেলা আলো ছায়ার খেলা দেখা যায়। একটি ভবনের গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ দূর করতে এখানে এধরনের ফ্রেমের ব্যবহার অনেকাংশে যথার্থ বলে বিবেচনা করা যায়। এছাড়াও ফ্রেমগুলো ভিস্তা বা দৃশ্য বন্ধনী তৈরীতে বড় একটা ভূমিকা রাখে। যেকোন ভবনে এরকম ভিস্তা তৈরী তা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত হোক, এতে স্থপতির শুধু কৃতিত্বই প্রকাশ পায় না, প্রকাশ পায় তার রুচি এবং সূক্ষ্ম অভিসন্ধি৷ |
|
|
|
|
|
চারতলা এই হলটি সম্পূর্ণভাবে দুটি উইং-এ বিভক্ত। মূল এই উইং দুটি ছাত্রদের থাকার জায়গা। উইং দুটি আবার অক্ষের দিক থেকে দুভাগে বিভক্ত। এগুলোর সমান্তরাল অংশটিতে চার শয্যার রুমগুলো রয়েছে আর দুই শয্যার রুমগুলো রয়েছে বাঁকা অংশ দুটিতে। হলের সিনিয়র ছাত্রদের জন্য এসব দুই শয্যার রুমগুলো তৈরী করা হয়েছে। একই তলায় দুই শয্যা ও চার শয্যার এ রুমগুলোর সংমিশ্রণ সমন্ধে স্থপতির মতামত হচ্ছে-এতে করে সিনিয়র জুনিয়রদের নিজেদের মধ্যে পরিচিতি এবং সম্পর্ক ভাল থাকার একটা সুযোগ থাকে। উইং দুটোর মাঝে হোস্টেলটির সব সাধারন ফ্যাসিলিটিসগুলো রয়েছে। যেমন: উপরে নামাজের রুম, টিভি রুম এবং নীচে কমোন রুম, লন্ড্রি, ক্যান্টিন, ডাইনিং, ওয়েটিং রুম, অফিস রুম,লাইব্রেরী। ভবনটিতে দুটি অর্ধ বৃত্তাকার অংশ রয়েছে। এদের একটি একতলা, ভবনের সামনে অবস্থিত এবং অপরটি দোতলা, কোর্ট ইয়ার্ডের সাথে অবস্থিত। সামনের অংশটি ব্যবহৃত হয় ওয়েটিংরুম হিসেবে। দোতলা বৃত্তাকার অংশটির নীচে কমোন রুম এবং লন্ড্রি আর উপরে নামাযের রুম ও ওযু খানা। এই বৃত্তাকার অংশ দুটির ছাদগুলো ছাত্ররা যথাক্রমে দোতলা ও তিনতলার টেরেস হিসেবে ব্যবহার করে। |
|
|
|
হোস্টেল ভবনটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এর দুই বাহু বা উইং-এর মধ্যে ব্রীজ সংযোগ। সাধারণত আমাদের দেশে গতানুগতিক হোস্টেল গুলোতে এরূপ ব্রীজ সংযোগ চেখে পড়ে না। যেটি দেখা যায় তা হচ্ছে দুটো উইং সম্পূর্ণ আলাদাভাবে দাঁড়িয়ে আছে এবং একতলার করিডোর ছাড়া এদের মধ্যে কোন সংযোগ নেই। এক্ষেত্রে কাউকে এক উইং থেকে অন্য উইং-এ যেতে হলে তাকে একতলায় নেমে তারপর যেতে হবে। এর ফলে সেসব হোস্টেলে ছাত্র/ছাত্রীদের মধ্যে যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতা দেখা যায়। কিন্তু খান জাহান আলী হলের ব্রীজ কানেকশন ছাত্রদের নিজেদের মধ্যে স্বতঃস্ফুর্ত যোগাযোগের যেমন সুযোগ করে দিয়েছে তেমনি নান্দনিকতার আলোকেও এটিকে সার্থক বলা যায়। |
|
হোস্টেল ভবনটির নকশারীতি খুটিয়ে বিচার করতে গেলে হয়ত অনেক ভুল ত্রুটি এবং নির্মাণ ব্যর্থতা পাওয়া যাবে। শুধু এ ভবনটির ক্ষেত্রে নয় পৃথিবীর যত বড় বড় স্থাপত্য কর্ম আছে সব কর্মকেই পুরোপুরি সার্থক বলা যায় না। এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং কিছু ব্যর্থতার বোঝা নিয়ে একটি স্থাপত্যকর্ম কতটুকু মানুষকে দিতে পেরেছে তার উপরই এর সার্বিক সার্থকতা নির্ভর করছে। এসবের বিচারে ‘খান জাহান আলী হল'কে আমরা অনেকটা সার্থক প্রকল্পের কোঠায় ফেলতে পারি। একটি হোস্টেল ভবনের মূল যে সব চাহিদা রয়েছে, যেমন - পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, বাসিন্দাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ, বিনোদন বা খেলাধূলার সুযোগ ইত্যাদি বিষয়ের চাহিদা মেটাতে স্থপতিরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন একথা অস্বীকার করার নয়। বিশ্ববিদ্যালয় অথবা অন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখা পড়ার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষার তাগিদেই হোক আর হোস্টেল ভবন নকশায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনেই হোক - এখানে খান জাহান আলী হল এক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। |